Sultan Tugril Bey & Seljuk
সুলতান তুগরিল বে
সেলজুকদের পূর্বকথা----------------
তুর্কি সাম্রাজ্যসমূহের উত্থানঃ
তুর্কিরা অবস্থান করতো চীন সীমান্ত থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল মরুভূমি ও স্তেপে। আজকের মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান, চীন সীমান্ত ও রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলে ছিল তাদের আদি বাসস্থান।
খাদ্য ও মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার জন্য সবর্দা লড়াই করতে হতো তুর্কীদের। চীনাদের মত শক্তিশালী প্রতিবেশী ও তাদের অত্যাচারের মুখে পড়তে হতো তুর্কীদের।জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর নিজেদের মাঝে অনবরত সংঘর্ষের কারণে তুর্কীরা তাদের জন্মভূমি ছেড়ে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপ অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।
৫৫২ খ্রিস্টাব্দে গোকতুর্ক বা ”নীল তুর্কী” নামে খ্যাত তুর্কী'রা তাদের প্রথম সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে তাদের ক্ষমতা প্রসারিত হয়েছিল।তাদের সমসাময়িক কালে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে কাজার খানাত নামে তুর্কিদের আরেকটি সাম্রাজ্যের উত্থান হয়। যারা ৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল এছাড়াও ওগুজ ইয়াবগু রাজ্য (750-1055) বেশ উল্লেখযোগ্য।
এসব সাম্রাজ্যের ধর্ম ছিল তুর্কিদের পৌত্তলিক ধর্মবিশ্বাস টেংরিজম, শামানিজম, কখনো'বা বৌদ্ধ। কখনো ইহুদিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল কিছু তুর্কী সম্রাট।
৮৪০ খ্রিস্টাব্দে উত্থান হয় কারাখানিদ সাম্রাজ্যের। যারা পরবর্তীতে সম্পূর্ণভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। কারাখানিদরা ছিল কার্লুক গোত্রের লোক। এই গোত্র থেকেই ৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে আলপ্তগিন ও সবুক্তগিনের হাত ধরে উত্থান হয় গজনবী সাম্রাজ্যের। বিখ্যাত গজনীর সুলতান মাহমুদ ছিলেন সবুক্তগিনের সুযোগ্য পুত্র। মূলত তার হাত ধরেই তুর্কীরা প্রথম ইসলামি সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।
তুর্কিদের এসব সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল রাশিয়ার ভলগা নদীর তীর থেকে ট্রান্সঅক্সিয়ানা বা আধুনিক উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজিস্থান ইত্যাদি রাষ্ট্র হয়ে চীন সীমান্ত পর্যন্ত। সময়ের ব্যবধানে চীনের ট্যাং রাজবংশ সহ আরো বহু জাতির সাথে সংঘাতে জড়িয়েছে তুর্কী রা। নিজেদের মাঝেও বিবাদে জড়িয়েছে। সুলতান মাহমুদ তুর্কিদের ভারত উপমহাদেশে নিয়ে আসেন।আফগানিস্তান, ইরান ইত্যাদি তার দখলে আসে।
তুর্কিরা ছিল পৌত্তলিক। টেংরিজম ছিল তাদের বিশ্বাস। তবে সময়ে সময়ে তারা বৌদ্ধ ধর্ম, ইহুদিবাদ কিংবা শামানিজমের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল। তুর্কিদের সাথে ইসলামের প্রথম পরিচয় ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে। মুসলিম সেনাপতি রবিয়া বিন মালিক রাঃ ”বিলাদুল বাব“বা আধুনিক সিরিয়ার ”আলেপ্পো” নগরীর দরজায় পৌঁছান।সেখানে তুর্কী নেতা শাহরিবাজের অধীনে তুর্কী রা থাকতো। রবিয়া বিন মালিক রাঃ শাহরিবাজকে সন্ধির প্রস্তাব দিলে শাহরিবাজ মেনে নেন ও পরবর্তীতে তিনি দলবল সহ ইসলাম গ্রহণ করে নেন।
পরবর্তীতে মুসলমানরা মধ্য এশিয়ার আরো ভেতরে ঢুকে পড়ে, সমরখন্দ, তিবরিস্তান ইত্যাদি মুসলমানদের অধীনে আসে। ট্রান্সঅক্সিয়ানায় মুসলমানরা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে ক্রমে ক্রমে মুসলিমরা তুর্কিদের প্রতিবেশী হয়ে উঠে ও তুর্কিদের মাঝে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে।
তুর্কিরা ছিল গোত্রভিত্তিক জাতি। গোত্রীয় শাসন তাদের মাঝে সর্বজনীন ছিল। তাই তুর্কীদের মাঝে গড়ে উঠেছিল বহু গোত্র। ওগুজ খানের হাত ধরে গড়ে ওঠা ওগুজ গোত্র ছিল এরকমই একটি গোত্র। ওগুজ গোত্রের শাখা গোত্র ছিল মোট চব্বিশটি। এরমধ্যে কিনিক ছিল বেশ অগ্রগামী একটি গোত্র। ঐশ্বর্য ও ধনসম্পদের দিক থেকে তারা বেশ প্রাচুর্যপূর্ণ ছিলো। এর কারনটাও স্পষ্ট, কিনিক গোত্রের অধিপতি দুকাক ছিলেন কাজার খানাতের (৬৫০-৯৬৯) উজির কিংবা সেনাপ্রধান। এ রাজ্যে তিনি বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। ওগুজ ইয়াবগু রাজ্য ছিল টেংরিজমে বিশ্বাসী। বলা হয়ে থাকে, কিনিকদের মাঝে দুকাক সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
দুকাক মৃত্যুবরণ করলে তার সুযোগ্য পুত্র সেলজুক'ও বেশ প্রসিদ্ধ ও স্বনামধন্য হয়ে উঠেন। গোত্র প্রধান হওয়ার পাশাপাশি ইয়াবগু রাজ্যের খান তাকে রাজ্যের সেনাপ্রধানের পদে বসান।
সেলজুকের সময়কালীন ইয়াবগু খান ছিলেন শারীরিকভাবে অসুস্থ। সেলজুক বের সাহসিকতা ও প্রসিদ্ধির কারণে ইয়াবগু খানের স্ত্রী ধারণা করলেন যে, সেলজুক বে হয়তো সাম্রাজ্যের খান হতে চাইবে। তাই তিনি সেলজুক বে'কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন।
ভাগ্য ভালো ছিল সেলজুক বের। আগেভাগেই জেনে ফেললেন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথা। তাই সঙ্গীদের নিয়ে পালিয়ে গেলেন সমরখন্দের কাছে আধুনিক কাজাখস্থানের জান্দ শহরে। সেখানে গিয়ে নিজের ও তার গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন। পরবর্তীতে ওগুজ ইয়াবগু রাজ্যকে কর দিতে অস্বীকার করেন সেলজুক বে। তিনি বলেন, ❝মুসলিম কখনো অমুসলিমদের কর দিবেনা❞। তাই তো ইমাম বায়হাকি সেলজুক কে সম্বোধন করেছেন ”গাজি মালিক” আর মুজাহিদ হিসেবে।
সামানিদের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাঃ
সামানিরা ছিল পারস্যের অধিবাসী। ৮১৯ খ্রিস্টাব্দে নুর, আহমদ, ইয়াহইয়া এবং ইলইয়াস নামে চার ভাই এ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তারা মুসলিম হলেও ৯০০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসিয় খিলাফত থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন ইসলামি সাম্রাজ্যের ঘোষনা দেয়।
এদিকে সেলজুক বে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলে সামানিদরা সেলজুক বে কে কাছে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। সেলজুক বে নিজেও সামানিদের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেন তার গোত্রের উন্নতির জন্য। এরমধ্যে কারাখানিদ সম্রাট বুগরা খান সামানিদের শহর বুখারা দখল করে নেন। সামানিদ শাসক সেলজুক বে কে শহর উদ্ধারে সাহায্য করার অনুরোধ জানান। সেলজুক বের সহায়তায় বুখারা উদ্ধার করা হলে, সামানিদদের কাছে সেলজুক বের মর্যাদা বেশ উন্নিত হয়। ফলশ্রুতিতে 'জান্দ' শহরের অধিকার পান সেলজুক বে।
এভাবে সেলজুক বে সামানিদের অন্যতম প্রধান মিত্র হয়ে উঠেন। কিন্তু কারাখানিদ ও গজনবিদের সাথে উপপূর্যরী লড়াইয়ে আর টিকে থাকতে পারেনি সামানিদরা। ৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে পতন ঘটে তাদের।
সামানিদ সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে তাদের শহর আর অঞ্চলগুলোর দখল চলে যায় গজনীদের হাতে। গজনীর সুলতান মাহমুদ কারাখানিদদের সাথে সন্ধি করে মোটামুটি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করেন। সেলজুকরা ছিল ট্রান্সঅক্সিয়ানা বা মধ্য এশিয়ার নতুন শক্তি। সামানিদদের পতনে সেলজুকদেরও বেশ লাভ হয়েছিল। সেলজুক বে নিজের সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। সামানিদ সাম্রাজ্যের বহু সেনা তার দলে যোগ দিয়েছিল। ১০০৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন সেলজুক বে। তার মৃত্যুর পর গোত্রের প্রধান হন বড় ছেলে আরসালান ইসরাইল। পিতার মত সাহসী ছিলেন আরসালান ইসরাইল।
এদিকে সেলজুকদের উত্তরোত্তর শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার সংবাদ শুনে কারাখানিদ আর মাহমুদ গজনবি উভয়ের মাথা খারাপ হয়। মাহমুদ গজনবি সেলজুকদের মাথা উঁচু করার আগেই পিষে ফেলতে চাইলেন। তাই কৌশলে আরসালান ইসরাইলের কাছে সন্ধির সংবাদ পাঠিয়ে তাকে আমু দরিয়ার তীরে আসতে বললেন। আরসালান ইসরাইল সুলতান মাহমুদের কুটচাল বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি সরলমনে সুলতান মাহমুদের কাছে গেলেন। পুত্র কুতুলামিশের কাছে তিনহাজার সেনার একটি দল রেখে মাহমুদের দরবারে পৌঁছলেন আরসালান ইসরাইল। সুলতান মাহমুদ প্রথমে তাকে জিহাদের লোভ দেখালেন ও সাহায্যের অনুরোধ জানান। আরসালান বলেন, ❝আপনার খেদমত করতে আমার কোন আপত্তি নেই❞।
ওদিকে আরসালান জানেন না, তার লোকদের সাথে কি ঘটতে চলেছে!
সুলতান মাহমুদ সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আরসালানের সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কে হত্যা আর বাকীদের বন্দী করে নিয়েছিলেন। যারা বেঁচে ছিল, তারা কোনমতে পালিয়ে আমু দরিয়া পাড়ি দেন ও খোরাসানে চলে যান।এরপর সুলতান মাহমুদ আরসালান ইসরাইল ও তার ছেলে কুতুলামিশ কে আটক করে ফেলেন। আরসালান এরপর সাত বছর বেঁচে ছিলেন, তারপর ভারতের কালিঞ্জর দূর্গে বন্দী অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।
আরসালান ইসরাইল কে বন্দী করার পর সেলজুকদের প্রধান হন তার ভাই মিকাইল বিন সেলজুক। মিকাইল বুঝতে পেরেছিলেন, গজনবিদের সাথে লড়াইয়ে টিকতে পারবেন না তিনি। তাকে চলে যেতে হবে অন্য কোথাও। তাই মিকাইল সুলতান মাহমুদের কাছে দলবল সহ খোরাসান চলে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। সুলতান মাহমুদ ভাবলেন, আরসালান ইসরাইল যেহেতু নেই তাই তারা তো দূর্বল। তাদের কে যাওয়ার অনুমতি দিলেন সুলতান মাহমুদ।
মিকাইল বিন সেলজুক খোরাসানকে নিজের লক্ষ্যস্থল হিসেবে নির্ধারন করে নিয়েছিলেন। তাই আমু দরিয়া পাড়ি দিয়ে খোরাসান গেলেন মিকাইল। সেখানে পৌঁছেই শক্তিবৃদ্ধি তে মনযোগ দিলেন তিনি। শহর ও গ্রামগুলোতে অভিযান চালাতে শুরু করলেন মিকাইল। গজনবিদের সীমান্তেও অভিযান চালাচ্ছিলেন তিনি। এ সংবাদ শুনে মাহমুদ গজনবি খোরাসান আসলেন, এবার সেলজুকদের চিরতরে মুছে ফেলবেন তিনি।
__________সুলতান মাহমুদ গজনবি গজনি, হেরাত, সিজিস্থান সহ খোরাসানে তার অধীনস্ত সকল আমিরদের সেনাবাহিনী পাঠানোর নির্দেশ দিলেন। সেলজুকরাও নিজেদের জানমাল রক্ষার প্রস্তুতি নিল।
অবশেষে ১০২৮ খ্রিস্টাব্দে আধুনিক তুর্কমেনিস্থানের ফারওয়া গ্রামের কাছে সুলতান মাহমুদের বিশাল গজনবী সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয় সেলজুকরা।
সেলজুকরা পরাজিত হয় ও তাদের চার হাজার অশ্বারোহী সহ অধিকাংশ সেনা নিহত হয়। যারা বেঁচেছিল তারা খোয়ারিজমের নিকটে দিহিস্থান ও অন্যান্য শহরে পালিয়ে যায়।
মিকাইল বিন সেলজুকের মৃত্যু ও তার উত্তরাধিকারঃ
এ যুদ্ধের পরের বছর ১০২৯ সালে মিকাইল বিন সেলজুক খ্রিস্টান তুর্কিদের সাথে লড়াইকালে শহিদ হয়ে যান।
মৃত্যুর পূর্বে মিকাইল তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ছোট ছেলে তুগরিল কে নির্বাচন করে যান। বড় ভাই চাগরি বেগ তুগরিল বেগের নেতৃত্ব মেনে নেন।
তুর্কিদের কিংবদন্তি এই দুই ভাইয়ের হাতে লেখা হলো সেলজুকদের নতুন ইতিহাস। একজন স্বরণীয় সুলতান তুগরিল হিসেবে, অন্যজন বিখ্যাত খোরাসানের সিংহ হিসেবে।
1ঃদাওলাতুস সালাজিকা/ডক্টর মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
2ঃতারিখুদ দাওলাতিস সালাজিক/ডক্টর মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
3ঃThe great seljuk empire by A.C.S Peacock
5ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজুক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
-----------------------------------------
মধ্যযুগে পৃথিবীর সবচেয়ে সংঘর্ষময় অঞ্চলগুলোর একটি ছিলো খোরাসান। বর্তমানে খোরাসান ইরানের উত্তর-পূর্ব প্রদেশের একটি শহর হলেও মধ্যযুগ ও প্রাচীন যুগে খোরাসান বলতে একটি বৃহত্তর এলাকাকে বুঝানো হত।ট্রান্সঅক্সিয়ানা বা মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ এলাকা ছিল খোরাসানের অধীনে।
আজকের সমগ্র আফগানিস্তান, ইরান, উজবেকিস্থান, তুর্কমেনিস্তানের বেশ কিছু অঞ্চল কে খোরাসানের অধীনে প্রকাশ করা হতো। দশম শতাব্দিতে আধুনিক তুর্কমেনিস্থানের মার্ভ, ইরানের নিশাপুর, আফগানিস্তানের বলখ ও হেরাত ছিল খোরাসানের প্রধান শহর ও কেন্দ্র।
মুসলিমরা সর্বপ্রথম সাসানিদ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে খোরাসান ছিনিয়ে নিতে শুরু করে। কালের পরিক্রমায় খোরাসানের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ে জড়িয়েছে সামানিদ সাম্রাজ্য, কারাখানিদ সাম্রাজ্য ও গজনভি সাম্রাজ্য।
১০২৭ সালে আধুনিক তুর্কমেনিস্তানের ফারওয়া গ্রামের কাছে এক যুদ্ধে গজনভি সাম্রাজ্যের কাছে পরাজিত হয়ে খোরাসানে চলে আসেন সেলজুক পরিবারের সদস্যরা।
এর পর থেকেই খোরাসানে নিজেদের ভাগ্য অন্বেষণের সিদ্ধান্ত নেন তারা। তাই খোরাসানের সাথেই মিশে আছে সেলজুকদের ইতিহাস।তাদের সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে উঠে এই খোরাসানেই ।
আলি ইবনে হাসানের সাথে জোট ও সংঘাতঃ
আলি ইবনে হাসান বা আলি তেগিন ছিলেন কারাখানিদ সাম্রাজ্যের ট্রান্সঅক্সিয়ানার শাসক। ১০২০ সাল থেকে ১০৩৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ট্রান্সঅক্সিয়ানায় নিজের শাসন বহাল রেখেছিলেন। সেলজুকদের সাথে আলি তেগিনের সম্পর্কের শুরু ১০২৪/২৫ সালের দিকে। যখন আলি তেগিন তার চাচাতো ভাই কাদির খান ও গজনবি সাম্রাজ্যের সুলতান মাহমুদের কাছে পরাজিত হয়ে বুখারা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর অধিকার হারান। সেলজুক বেগের পুত্র আরসালান ইসরাইলের অধিনে সেলজুকরা তখন মধ্য এশিয়ার নবশক্তিতে পরিণত হচ্ছিল। কৌশলী ও বুদ্ধিমান আলি তেগিন সেলজুকদের সাথে জোট বাঁধেন ও বুখারা উদ্ধার করেন। পর্যায়ক্রমে আধুনিক তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের বিশাল অংশে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সময়ের পরিক্রমায় আলি তেগিন দেখতে পান সেলজুকরা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, যা আলি তেগিনের মাথাব্যথার জন্য যথেষ্ট ছিল। ১০২৯ সালে মিকাইল বিন সেলজুক মারা যাওয়ার পর তুগরিল বে দায়িত্ব গ্রহণ করলে সেলজুকরা তার আনুগত্য মেনে নিয়েছিল। আলি তেগিন সেলজুকদের মাঝে ফাটল ধরানোর উদ্দেশ্যে তুগরিল বের চাচাতো ভাই ইউসুফ ইবনে মুসাকে সকল সেলজুক ও তুর্কির নেতা হিসেবে ঘোষণা দিলেন। ইউসুফ ইবনে মুসা ছিলেন বুদ্ধিমান ও সৎ ব্যক্তি। তিনি আলি তেগিনের খারাপ উদ্দেশ্য বুঝে গিয়েছিলেন। তাই আলি তেগিনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন তিনি। আলি তেগিন রাগে ক্ষোভে ইউসুফকে হত্যা করে ফেলেন।
ভাই হত্যার সংবাদ শুনে তুগরিল বে ও চাগরি বে আলি তেগিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষনা দেন। ১০২৯ সালের শেষের দিকে আলি তেগিনকে একটি যুদ্ধে পরাজিত করেন সেলজুকরা। পরবর্তীতে আলি তেগিন শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় সেলজুকদের চ্যালেঞ্জ জানান।
অবশেষে ১০৩২ সালে সমরখন্দ ও বুখারার মাঝামাঝি ডাবুসিয়া নামে একটি গ্রামের কাছে উভয় সেনাবাহিনী মুখোমুখি হয়। সেলজুকরা এ যুদ্ধে মারাত্মকভাবে পরাজয় বরণ করে। তাদের অনেককে হত্যা এবং নারী ও শিশুদের বন্দী করা হয়।
আলি তেগিনের কাছে পরাজিত হয়ে সেলজুকরা ঐ অঞ্চলে অবস্থান করা অনিরাপদ মনে করল।
বাধ্য হয়ে তারা তল্পিতল্পা গুটিয়ে তাবু ফেললো তৎকালীন খোয়ারিজমের কাছে।
কালোবালির মরুভূমি ও মার্ভ বিজয়ঃ
আধুনিক তুর্কমেনিস্তান ও কাজাকিস্তানের বিশাল অংশ যে মরুভূমি দখল করে আছে তার নাম "কারাখুম ডেজার্ট"।তুর্কিরা এই কারাখুম মরুভূমি কে ডাকে ”কালো বালির ”মরুভূমি নামে। তুগরিল ও চাগরি বে তাদের সেনাদের নিয়ে কারাখুম মরুভূমিতে ছড়িয়ে পড়েন। সেলজুকদের উত্থানের পর হতেই তাদের প্রধান শত্রু ছিল গজনবীরা।তাই তুগরিল ও চাগরি বে উত্তর খোরাসান (আধুনিক ইরানের পূর্বাঞ্চল) থেকে গজনবীদের উৎখাত করতে অভিযান শুরু করেন। ”হিট অ্যান্ড রান“ ট্যাকটিস তথা "হামলা করো আর পালিয়ে যাও" এই পদ্ধতিতে সেলজুকরা গজনবীদের উপর হামলা চালাচ্ছিল। ১০৩২ সাল নাগাদ উত্তর খোরাসান থেকে গজনবীদের উৎখাত করতে সক্ষম হয় সেলজুকরা।
তৎকালীন খোরাসানের প্রধান চারটি কেন্দ্রের একটি ছিলো মার্ভ। যা আধুনিক ইরান সীমান্তে তুর্কমেনিস্তানের একটি শহর। উত্তর খোরাসান থেকে গজনবীদের উৎখাত করে এই শহর দখল করে নেন সেলজুকরা। উত্তর খোরাসানে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে তোলেন তুগরিল ও চাগরি বে। তুগরিল বে শহরের প্রশাসন সামলানোর দায়িত্ব নেন আর চাগরি বেকে দেওয়া হয় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব।
সুলতান মাসউদের সাথে প্রথম সংঘাত ও যুদ্ধঃ
১০৩০ সালে মৃত্যুবরণ করেন গজনভি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান মাহমুদ গজনভি। তার মৃত্যুর পর দু'পুত্র মাসউদ ও মুহাম্মদের মাঝে ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ বাঁধে। একপর্যায়ে মাসউদ তার ভাইকে পরাজিত করে গজনভি সাম্রাজ্যের সুলতান হন।
সেলজুকরা মার্ভে বিজয়ী হলেও খোরাসান জুড়ে গজনভিদের আধিপত্য ছিল লক্ষ্যনীয়। তাই সেলজুকদের শক্তিশালী মিত্রের দরকার ছিল যা তাদেরকে খোরাসানে টিকে থাকতে সহযোগিতা করবে।
এ পর্যায়ে সেলজুকদের সাথে মিত্রতার আহ্বান জানান খোয়ারিজমের শাসনকর্তা হারুন ইবনে আলতুনতাশ।হারুন ইবনে আলতুনতাশের সাথে গজনভিদের বিরোধ ছিল, তাই তিনিও খোরাসান থেকে গজনভিদের বিদায় করতে চাইছিলেন। হারুন ইবনে আলতুনতাশ সেলজুকদের খোয়ারিজমের নিকটে বসতি গড়ার অনুমতি দিলে সেলজুকরা সেখানে বসতি স্থাপন করে।কিন্তু, জান্দের শাসনকর্তা শাহ মালিক আর হারুন ইবনে তুনতাশের মাঝে গোপন চুক্তি হয়। তারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে সেলজুকদের ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়।
চুক্তি মোতাবেক উভয় শাসক মিলে সেলজুকদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। সেলজুকরা আবারো গণহত্যার শিকার হয়, তাদের যোদ্ধারা নিহত হয়।
সেনাবাহিনী আর বসতির একটি অংশ হারিয়ে সেলজুকরা তুলনামূলকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে। তাই চাগরি বে সুলতান মাসউদের কাছে আনুষ্ঠানিক আনুগত্য স্বীকার করে একটি পত্র লিখেন। চাগরি বে সুলতানের কাছে আধুনিক ইরানের নিশাপুরের কাছে তাদের বসতি স্থাপনের জন্য একটি জায়গার আবেদন করেন। তারা সুলতান কে সবসময় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
নিশাপুরের আমির সুরি ইবনে মুতাযের মাধ্যমে পত্রটি সুলতান মাসউদের কাছে প্রেরণ করা হয়। সুলতান মাসউদ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এ পত্রের উত্তর দেন।এমনকি সেনাপ্রধান বুকতাগ্দিকে নির্দেশ দেন যেনো খোরাসান থেকে সেলজুকদের নাম-নিশানা মুছে দেয়া হয়।
১০৩৫ সালে জুনে গজনভি সেনাপ্রধান বুকতাগ্দি সেলজুকদের পরাজিত করার লক্ষ্যে নিশাপুরের কাছাকাছি নেসা শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।তুগরিল বে ও চাগরি বে গজনভিদের ফাঁদে ফেলেন। তারা নেসা শহরের আশেপাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঘোড়া, ভেড়া ও অন্যান্য আসবাবপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখেন। গজনভি সেনারা এগুলোকে গণীমত মনে করে সংগ্রহ করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তারা নেসা শহরের কাছাকাছি এসে পড়ে, আর সেখানে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তুগরিল বে ও চাগরি বে।
প্রথমেই অতর্কিত হামলার শিকার হওয়া গজনভি সেনাবাহিনী আর ঘুরে দাড়াতে পারেনি। মরণপণ লড়াই করেও ময়দানে টিকতে পারেনি সেনাপ্রধান বুকতাগ্দি।তিনি পালিয়ে যান ও আরেক সেনাপতি হুসাইন বিন মিকাইল আটক হন।
এটি ছিল সেলজুকদের কাছে গজনভি সাম্রাজ্যের প্রথম পরাজয়।এ যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ফলে নিরূপায় সুলতান মাসউদ সেলজুকদের সাথে সন্ধি করেন।
চুক্তিতে তুগরিল বে, চাগরি বে ও মুসা ইয়াবগু কে নেসা, ফারওয়া ও দিহিস্তানের অধিকার দেওয়া হয়।(এ অঞ্চলগুলি আধুনিক ইরান–তুর্কমেনিস্তান সীমান্তে অবস্থিত।)
গজনী সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে তাদেরকে ”দিহকান” (গভর্নরের ইরানি পদবি) উপাধি দেওয়া হয়।
গজনভিদের সাথে চুক্তির মাধ্যমেই মূলত সেলজুকরা খোরাসানের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃত পায়।
১ঃ—আল কামিল ফিত তারিখ/ অষ্টম খন্ড
২ঃতারিখুজ সালাজিকা/ ড.মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
৩ঃতারিখু সালাজিকাতুর রুম/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৪ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজু'ক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
৫ঃতারিখুস সালাজিকাহ্ ফি ইরান ওয়া ইরাক ওয়া খুরাসান/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৬ঃThe Great Seljuk Empire / A.C.S Peacock
7ঃ The Great Seljuk/ Aziz Basan
-----------------------------------------
দান্দানকানন যুদ্ধঃ সেলজুক সাম্রাজ্যের উত্থান
৯ রমজান ৪৩১ হিজরি মোতাবেক ১০৪০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মে সংগঠিত হওয়া দান্দানকানন যুদ্ধকে সেলজুক সাম্রাজ্য ও গ্রেট খোরাসানের ভাগ্য নির্ধারক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ যুদ্ধে সেলজুকরা গজনীর সুলতান মাসউদের নেতৃত্বাধীন বিশাল সেনাবাহিনী কে পরাজিত করে।
পটভূমিঃ---------
১০৩৫ সালে নিশাপুরের নিকটবর্তী নেসা শহরের কাছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রথমবারের মতো গজনভি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে সেলজুকরা। এ যুদ্ধের পর খোরাসান জুড়ে সেলজুকরা নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে শুরু করে। গজনীর সিংহাসন নিয়ে পুনরায় বিরোধ শুরু হলে সুলতান মাসউদ ১০৩৫ সালে গজনীতে ফিরে যান। অন্যদিকে ইরানের রায় শহর ও জুরজানে সুলতান মাসউদের নিয়োগকৃত গভর্নরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে শহরদুটি দখলে নেয় কতিপয় তুর্কি গোত্র। তাই খোরাসানেও গজনভিদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়ে।আফগানিস্তানের বলখ ছাড়া অন্যান্য এলাকাগুলোতে গজনভিদের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ছিলো না।বেশিরভাগ শহরের নিয়ন্ত্রণ ছিলো স্থানীয় যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীগুলোর হাতে। তাই এসব এলাকা দখলে নিতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি সেলজুকদের।
সেলজুকরা ছোট ছোট শহর ও এলাকাগুলো দখলে নেওয়ার পর সেলজুক প্রধান তুগরিল বেগ এবার নিশাপুরের দিকে দৃষ্টি দিলেন।
নিশাপুর ছিল তৎকালীন পৃথিবীর বৃহত্তম দশটি শহরের একটি, এছাড়া এই শহরকে খোরাসানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ৪২৯ হিজরির মুহাররম মাস মোতাবেক ১০৩৮ খ্রিস্টাব্দে তুগরিল বে ৩০০০ তীরন্দাজ নিয়ে নিশাপুরের প্রধান ফটকে অবস্থান নিলেন। শহরবাসী তুগরিল বেকে সানন্দে শহরে প্রবেশ করতে দেওয়ায় কোন যুদ্ধ ছাড়াই নিশাপুর সেলজুকদের অধীনে চলে আসে।
নিশাপুরে সুলতান মাসউদের সিংহাসনে বসেই তুগরিল বে নব সেলজুক সাম্রাজ্যের ঘোষনা দিলেন। তৎকালীন আব্বাসী খলিফা আল ক্বাইম বিআমরিল্লাহর (১০৩১-১০৭৫) কাছে চিঠি পাঠিয়ে নতুন সালতানাতের সংবাদ জানালেন তাকে। সুলতান তুগরিল বে নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন আর জুমুআ'র খোতবায় তার নামে দোয়া করার নির্দেশ জারী করলেন।
সুলতান মাসউদের প্রতিক্রিয়া ও সেনাবাহিনী গঠনঃ
কথায় আছে না, এক জায়গায় দুজন শাসকের জায়গা হয়না! এখানেও ঠিক সেটাই হলো। এমনিতেই সেলজুকদের অগ্রগতির সংবাদ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন সুলতান মাসউদ। নতুন সাম্রাজ্য ঘোষনার সংবাদ তাকে মারাত্মকভাবে ক্রুদ্ধ করে তোলে। সুলতান মাসউদ অনতিবিলম্বে যুদ্ধ পরিষদ আহ্বান করলেন।
সুলতান মাসউদ সেলজুকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্নক যুদ্ধের ডাক দিলেন। গজনী সাম্রাজ্যের অধীনস্ত সকল গভর্নরদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ঘোষনা করা হলো। ১০৩৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সুলতান মাসউদ গজনী শহর ত্যাগ করে খোরাসানের উদ্দেশ্য যাত্রা করেন।তার সেনাসংখ্যা সম্পর্কে ইবনুল আসির লিখেছেন , ”সুলতান মাসউদের সেনাবাহিনী ছিল একলাখ অশ্বারোহী আর বিশাল বিশাল ষাটটি রণহাতী দিয়ে গঠিত।” তৎকালীন খোরাসানের যেকোন সেনাবাহিনীকে দুমড়ে মুচড়ে দিতে এরা যথেষ্ট ছিল।
যুদ্ধের পরিকল্পনা ও প্রাথমিক সংঘর্ষঃ
সেলজুকরা সাম্রাজ্যের ঘোষনা দেওয়ার পরও তারা একস্থানে অবস্থান করতেন না। শুধুমাত্র দাপ্তরিক কাজে সুলতান হিসেবে তুগরিল বে নিশাপুরে অবস্থান করতেন।কিন্তু, সেলজুক রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্য যেমন সেনাপ্রধান চাগরি বে, ইব্রাহিম ইনাল কিংবা মুসা ইয়াবগু তারা সবসময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতেন। তাদের সাথে লড়াই করা মোটেও চাট্টিখানি কথা ছিল না।
তাই সোজা গিয়ে নিশাপুর দখল করলে যে কোন লাভ হবে না, এ কথা সুলতান মাসউদকে বুঝিয়েছিলেন তার উপদেষ্টারা। মাসউদ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বলখে (আফগানিস্তানের শহর) অবস্থান করবেন ও সেনাবাহিনী কে কয়েকভাগে ভাগ করে বিভিন্ন দিকে পাঠাবেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেনাবাহিনীর একাংশকে পাঠানো হলো নিশাপুর দখল করতে। নিশাপুরে সুলতান তুগরিল বে ও ইব্রাহিম ইনালের হাতে মারাত্মকভাবে পরাজিত হলো গজনভি সেনাবাহিনীর একাংশ।
অন্যদিকে চাগরি বেগ আফগানিস্তানের ”পুল-ই-কারাভান” নামক স্থানে তাবু ফেলা গজনভি সেনাবাহিনীর উপর গেরিলা হামলা চালানো শুরু করলেন। বলখে বসে বসে এসব সংবাদ শুনতে শুনতে বিরক্ত হলেন সুলতান মাসউদ। খোরাসানের ভেতরে ঢুকে সেলজুকদের নিঃশেষ করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি। সেনাবাহিনীর কমান্ড তুলে নিলেন নিজের হাতে।
সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে বলখ থেকে রওয়ানা হলেন সুলতান মাসউদ। তার প্রথম উদ্দেশ্য ছিল চাগরি বের সাথে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করা এবং তাকে আটক করা। চাগরি বে জানতেন এত বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা তার সাধ্যে নেই। তার সেনাসংখ্যা ছিল দশ হাজারের কম। চাগরি বে গা ঢাকা দিলেন আর তীরন্দাজদের একটি দল রেখে গেলেন। যারা পালাক্রমে তীর ছুড়ে সুলতান মাসউদ কে ব্যস্ত রাখছিল।শেষপর্যন্ত নিরূপায় হয়ে সুলতান সামনে এগিয়ে গেলেন।
এদিকে বিশাল গজনবী সেনাবাহিনী আসার সংবাদ শুনে ইব্রাহিম ইনাল আর তুগরিল বে প্রমাদ গুনলেন। চাগরি বের কাছে সংবাদ পাঠালেন যে, ”তারা কোনমতে খোরাসান ছেড়ে পালিয়ে ইরানের "রায়" ও জুরজান শহরে চলে যাবেন। সেখান থেকে আনাতোলিয়া কিংবা আযারবাইজানে অভিযান চালানো যাবে। এতো বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তারা লড়াই করতে পারবেন না।“
চাগরি বে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। খোরাসান ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিতে বললেন তাদেরকে।
চাগরি বে চিন্তা করছিলেন এতো বিশাল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করবেন কিভাবে??
তৎকালীন বলখ থেকে মার্ভের দূরত্ব ছিলো প্রায় একহাজার কিলোমিটার। পথে ছিলো ধূ ধূ মরুভূমি, পাথুরে ভূমি আর পর্বত। মরুভূমিতে রণহাতী ছিল একেবারেই অকেজো। যেহেতু এই সেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়, তাই গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমেই গজনভিদের পরাজিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন চাগরি বেগ।
চাগরি বে গজনভি সেনাবাহিনীর রসদ ও পানির যোগান আটকে দিতে লাগলেন। পুরোটা পথজুড়ে গজনভিদের হয়রানি করলেন তিনি।ভারী অস্ত্রস্জ্জিত গজনভি সেনারা সেলজুকদের গেরিলা আক্রমণের মুখে হাসফাঁস করতে লাগলো।১০৩৯ সালের জুন মাসে ক্লান্ত সেনারা যখন সেলজুকদের নিয়ন্ত্রণাধীন "সারাখস"এ (তুর্কমেনিস্তানের শহর) পৌঁছল,সেলজুকরা শহর ছেড়ে পালিয়ে গেলো।সুলতান মাসউদ খালি শহর ছাড়া কিছুই পেলেন না।
বছরের পর বছর যুদ্ধাবস্থার কারণে খোরাসানজুড়ে তখন শুরু হয়েছে দুর্ভিক্ষ।এদিকে সুলতান মাসউদের সেনাবাহিনীর রসদ আটকে দিয়েছিলেন চাগরি বেগ,তাই মাসউদের সামনে দুটোই পথ খোলা ছিল।হয়তো যুদ্ধ করে রসদ উদ্ধার করতে হবে, নতুবা তাদের সাথে চুক্তি করতে হবে।সুলতান মাসউদ সেলজুকদের নিশাপুর,মার্ভ ছেড়ে পুনরায় নেসা, ফারওয়া ও দিহিস্তানে ফেরত যেতে বললেন।বিনিময়ে তিনি তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
তুগরিল বে একেবারেই খোরাসান ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু এবারও চাগরি বেগের শক্ত অবস্থানের কারনে সুলতান মাসউদের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন তিনি। সুলতান মাসউদকে তার উপদেষ্টারা হেরাতে (আফগানিস্তানের শহর) ফেরত যেতে বললেন,যাতে পুনরায় রসদসহ ফিরে এসে সেলজুকদের উপর হামলা করা যায়।কিন্তু,মাসউদ সেটা মানলেন না।তিনি হালকা অশ্বারোহীদের নিয়ে সেলজুকদের শক্তিশালী দূর্গ মার্ভের (তুর্কমেনিস্তানের শহর) পথ ধরলেন।
চুড়ান্ত যুদ্ধ (২৩ মে,১০৪০ খ্রিস্টাব্দ)
তুগরিল বে তখন তুস (ইরানের শহর) শহরে,আর চাগরি বে নেসা (ইরানের শহর) শহরে।মার্ভ শহরের সবচেয়ে নিকটবর্তী দূর্গ ছিল দান্দানকানন।চাগরি বে দ্রুতগতিতে দান্দানকানন দূর্গে পৌঁছে গেলেন,পানির সবগুলো উৎস তিনি ধ্বংস করে দিলেন, তারপর দূর্গ খালি করে লুকিয়ে রইলেন।অন্যদিকে তুগরিল বেও চাগরি বের সাথে যোগ দিলেন।
সুলতান মাসউদ দান্দানকানন দূর্গে পৌঁছে পানির খোঁজ করলেন,তার সেনা আর ঘোড়া সবগুলোই পিপাসার্ত। পুরো রাস্তাজুড়ে পানির দেখা পাননি তিনি।
দূর্গে পানি না পেয়ে সৈন্যরা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো,সেলজুকরা এবার প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসলেন।আচমকা হামলায় গজনভি সেনারা হকচকিয়ে গেলেও বিশাল সেনাসংখ্যার কারণে তারা ময়দানে টিকে গেলো।সেলজুক নেতারা মরণপণ দিয়ে লড়াই করছিলেন।সুলতান মাসউদ ও তার পুত্র মাওদুদের তীব্র হামলার মুখে বারবার সেলজুকরা পিছিয়ে যাচ্ছিল।কিন্তু,ওদিকে পানির পিপাসা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছিল,গজনভিরা হাঁপিয়ে উঠছিল একটু একটু করে।এবার চাগরি বে তার গোপন পরিকল্পনা কাজে লাগালেন,আচমকা ময়দানে নতুন সেনাদলের আগমন ঘটলো।
এরা হলো গজনভিদের তুর্কি মামলুক সেনারা, মাত্র কয়েকমাস আগে বিদ্রোহের অপরাধে যাদের নেতাগুলোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন সুলতান মাসউদ!
ক্লান্ত,শ্রান্ত গজনভি সেনাবাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়লো তুর্কি মামলুকরা।সেলজুক আর তুর্কি মামলুকদের সম্মিলিত হামলা একেবারে পিষে ফেললো গজনভিদের।
সুলতান মাসউদ তার ছেলেকে নিয়ে পালালেন,এর সাথে দান্দানকাননে রেখে আসলেন খোরাসানের ভাগ্য...........
১ঃ—আল কামিল ফিত তারিখ/ অষ্টম খন্ড
২ঃতারিখুজ সালাজিকা/ ড.মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
৩ঃতারিখু সালাজিকাতুর রুম/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৪ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজু'ক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
৫ঃতারিখুস সালাজিকাহ্ ফি ইরান ওয়া ইরাক ওয়া খুরাসান/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৬ঃThe Great Seljuk Empire / A.C.S Peacock
7ঃ The Great Seljuk/ Aziz Basan
সর্বসত্ব সংরক্ষিতঃ Devlet-E Alia-E Usmania
সুলতান তুগরিল বে---------চতুর্থ পর্ব
[নতুন দিগন্তের উদ্দেশ্যে যাত্রা ]
১০৪০ সালের ২৩ মে, দান্দানকাননের ময়দানে সেলজুকদের হাতে বিধ্বস্ত হলো গজনভি সেনাবাহিনী।সুলতান তুগরিলের অশ্বারোহী বাহিনী টানা তিনদিন যাবৎ গজনভিদের ধাওয়া করলো।তাদেরকে একেবারে আফগানিস্তানের সীমান্তে আমু দরিয়ার উপারে ধাওয়া করে নিয়ে গেলো সেলজুকরা ,যাতে খোরাসানে গজনভিদের নামগন্ধও পাওয়া না যায়।
বলখ ও হেরাতের বশ্যতা স্বীকার (১০৪০/১০৪১ খ্রিস্টাব্দ)
বলখ ও হেরাত শহরদুটি ছিল তৎকালীন খোরাসানের বৃহত্তম দুইটি কেন্দ্র ।বর্তমান আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত এই শহরদুটি অধিকার করা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ ।তাই দান্দানকানন যুদ্ধে বিজয়ের পরপরই চাগরি বে ”বলখ”ও মুসা ইয়াবগু বিন সেলজুক হেরাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।মুসা ইয়াবগু হেরাতের দরজায় কড়া নাড়তেই তাকে সাদরে গ্রহন করে নেন হেরাতের জনগণ।এমনিতেই গজনভিদের অত্যাচারের মুখে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল তারা,তাই সেলজুকদের আন্দোলনের প্রতি তারা আস্থাশীল হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে বলখে পৌঁছে বাঁধার সম্মুখীন হন চাগরি বে।চাগরি বে বলখের গজনভি গভর্নর আলতুনতাকের কাছে শহর হস্তান্তরের জন্য বার্তা পাঠালে গভর্নর চাগরি বের দূতদের আটক করে রাখে।নিরূপায় হয়ে চাগরি বে বলখ অবরোধ করেন।
অবরোধের কবলে পড়ে বলখের গভর্নর সুলতান মাসউদের কাছে বলখ অবরোধের সংবাদ পাঠালেন। এ সংবাদ পেয়ে সুলতান মাসউদ বলখের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী নিয়ে রওয়ানা হন।
আধুনিক আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের কাছে রোখজ গ্রামে এক যুদ্ধে প্রায় আটশো সেলজুক সেনাকে হত্যা করেন সুলতান মাসউদ।আরো অনেক কে বন্দী করা হয়।এরপর তিনি হেরাতে যান, সেখানে পৌঁছে অতর্কিত হামলা চালিয়ে মুসা ইয়াবগু কে হেরাত থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন তিনি।ইতোঃপূর্বে সুলতান মাসউদ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে নিহত হলে তার পুত্র মাওদুদ ক্ষমতায় বসেন।১০৪১ খ্রিস্টাব্দে বলখের নিকট এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সুলতান মাওদুদ কে পরাজিত করেন খোরাসানের সিংহ খ্যাত চাগরি বে।গজনভি বাহিনীর অনেকেই চাগরি বের দলে যোগ দেন।
যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সুলতান মাওদুদ পালিয়ে গেলে বলখের গভর্নর চাগরি বের কাছে শহর হস্তান্তর করেন।
এভাবে খোরাসান জুড়ে গজনভিদের প্রভাব যখন একেবারে শূন্যের কোটায় নেমে আসলো, তখন সেলজুকরা বুঝতে পারলো তাদের নতুন গন্তব্য বেছে নিতে হবে।মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ক্ষমতার বিস্তার করতে তাদের অবশ্যই নতুন ভূমির উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে।
১০৪৩ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক রাজপরিবারের সমস্ত সদস্য,তুর্কিদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা,সেনাপ্রধান,বড় বড় আলিমদের নিয়ে বৈঠকে বসল সেলজুকরা।তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা,যুদ্ধ নীতি ও সাম্রাজ্যের নীতিমালা নির্ধারণে এই বৈঠকের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।তুর্কিদের পরিভাষায় এ ধরনের বৈঠক কে বলা হয় "কুরুলুতাই"।
বৈঠকে সেলজুকদের অধীনস্ত ভূমিগুলোকে রাজপরিবারের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়।এর মাধ্যমেই মূলত সেলজুক পরিবার পৃথক হয়ে যায়।
কুরুলুতাইয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে চাগরি বেকে দেওয়া হয় মার্ভ শহর (আধুনিক তুর্কমেনিস্তানের শহর) ও মধ্য খোরাসানের অধিকাংশ এলাকা।
মূসা ইয়াবগুর ছেলে আবু আলি হুসাইনি কে দেওয়া হয় সিজিস্তান (আফগানিস্তান)ও হেরাত (আফগানিস্তান) ও তদীয় পার্শ্ববর্তী এলাকা।
চাগরি বের বড় পুত্র কার্ভুট বে নেন তাবুস (আধুনিক ইরান) ও কিরমানের (আধুনিক ইরান) অন্তর্ভুক্ত ভূমিসমূহ।
একইভাবে চাগরি বের দ্বিতীয় পুত্র "ইয়াকুতি বিন চাগরি বে কে আজারবাইজান ও আবহার (আধুনিক ইরান)--ইউসুফ ইনালের ছেলে ইব্রাহিম ইনালকে হামদান (আধুনিক ইরান),আরসালান ইসরাইলের ছেলে কুতুলামিশকে দামঘান (ইরান) ও জুরজান (ইরান) ইত্যাদি শহরগুলোর অধিকার দেওয়া হয়।
তুগরিল বেকে সুলতান হিসেবে ঘোষনা করা হলেও সেলজুক পরিবারের প্রত্যেক সদস্য মূলত স্বাধীনভাবে নিজ নিজ এলাকা পরিচালনার সুযোগ পান।যদিও সুলতান হিসেবে তুগরিল বেকে মান্য করা বাধ্যতামূলক ছিল।তুগরিল বে আপাতত নিশাপুরকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেন।
সাম্রাজ্য বিভাজন ও একটি নিরপেক্ষ আলোচনাঃ
প্রায় পঞ্চাশ বছর পূর্বে দুকাক ও তার পুত্র সেলজুক বের হাত ধরে আরম্ভ হওয়া সেলজুক আন্দোলন পূর্ণতা পায় দান্দানকানন যুদ্ধের মাধ্যমে।সেলজুক পরিবারের সবাই এতদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে,নিজেদের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে পথ চলেছে।১০৪৩ সালে কুরুলুতাইয়ের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেলজুক সাম্রাজ্যের ভূমিসমূহ পৃথক হয়ে গেলো।যেহেতু সেলজুকদের মাঝে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না,তাই পরিবারের প্রত্যেকেই ছিল সমান দাবীদার।
ফলে গৃহযুদ্ধ এড়াতে প্রত্যেককেই নিজস্ব ভূমি দেওয়া ও স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে সঠিক ছিল। কিন্তু,বৃহত্তর স্বার্থে এটি ছিল একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।যদ্দরুন,মাত্র একশো বছরের মাথায় ভেঙে পড়ে সেলজুক সাম্রাজ্য।এই একশো বছরে নিজেদের মাঝে বহুবার যুদ্ধে জড়িয়েছে সেলজুকরা,যা ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল সেলজুকদের।
যদিও সুলতান তুগরিল বে, আল্প আরসালান ও মালিক শাহ নিজেদের কোন্দল আর গৃহযুদ্ধগুলোকে যথাসম্ভব ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু তাদের পরের দূর্বল সুলতানরা সেটি পারেননি। ফলে সেলজুকদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল।
কিন্তু, কুরুলুতাই ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী পরিষদ। কারন, তুর্কিদের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও আলিমদের নিয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়েছিল। তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস খুব কম ব্যক্তিই দেখাতে পারতেন। ইমাম বায়হাকি রহিমাহুল্লাহু তার বই "তারিখে বায়হাকি" তে কুরুলুতাইয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, "স্বয়ং তুগরিল বে কিংবা চাগরি বেরও ক্ষমতা ছিল না একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার"।
সুতরাং কুরুলুতাই যদি এককভাবে শুধুমাত্র একজনকে বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের অধিপতি হিসেবে নির্বাচন করতো, সকল সেলজুক ভূমি শুধুমাত্র একজন ও অভিন্ন শাসকের অধীনে থাকতো তাহলে গ্রেট সেলজুকদের ইতিহাস হয়তো আরো দীর্ঘ হতো।
কিন্তু,আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন।
যাইহোক, প্রত্যেকে নতুন ভূমির মালিকানা পাওয়ার পর সেলজুকরা ছড়িয়ে পড়লেন ইরান ও ইরাক জুড়ে। বিজিত ভূখন্ডে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও বাকি অঞ্চল দখল করতে দুই ঈগলখচিত পতাকা উড়িয়ে ঘোড়ায় চড়লেন সেলজুক রাজপুত্ররা..........
নতুন ইতিহাস অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য ......
১ঃ—আল কামিল ফিত তারিখ/ অষ্টম খন্ড
২ঃতারিখুজ সালাজিকা/ ড.মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
৩ঃতারিখু সালাজিকাতুর রুম/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৪ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজু'ক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
৫ঃতারিখুস সালাজিকাহ্ ফি ইরান ওয়া ইরাক ওয়া খুরাসান/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৬ঃThe Great Seljuk Empire / A.C.S Peacock
7ঃ The Great Seljuk/ Aziz Basan
সুলতান তুগরিল বে----------------পঞ্চম পর্ব
[ইরান বিজয় (১০৪০–১০৫৫খ্রিস্টাব্দ)]
আধুনিক ইরান বলতে বর্তমানে যা বুঝানো হয় এগারোশো শতাব্দীর ইরান এর তুলনায় আরো বৃহৎ ও সম্পদশালী এলাকা ছিল। শত শত বছর ধরে ইরান ছিল বিখ্যাত পারস্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ও প্রধান অঞ্চল। এছাড়া এটি ছিল খোরাসানের অন্যতম যুদ্ধপ্রধান এলাকা, তাই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানকে বিবেচনা করা হতো এগারোশো শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে। মধ্য খোরাসান বিজয়ের পর অবশেষে তুগরিল বে ইরান বিজয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। বহু আগে থেকেই ইরান ছিল তুগরিল বের স্বপ্নের ঠিকানা, কিন্তু মধ্য খোরাসান ও গজনভিদের সমস্যা তার পথ আটকে দিচ্ছিল এতদিন ধরে।
আব্বাসি খলিফার স্বীকৃতি প্রদানঃ
সেলজুকদের উত্থান ঘটেছিল মুসলিম অধ্যুষিত খোরাসানে যেখানে মুসলিমদের শত্রু ছিল স্বয়ং মুসলিমরাই।গজনভি,সেলজুকি,কারাখানিদ,সামানিদ সকলেই ছিল মুসলিম।এক পর্যায়ে সেলজুকরা যখন খোরাসানে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হলো,সাধারণ মুসলিমদের নৈতিক আনুগত্য অর্জন করা ছিল তাদের জন্য সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।কারন,মুসলিম-মুসলিম লড়াইয়ে কে সত্য আর কে মিথ্যা সেটা নির্ধারন করা ছিল বেশ জরুরী।আর এ জন্য আব্বাসিদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়া কোন উপায় ছিল না,কারণ আব্বাসিরাই ছিল তৎকালীন পৃথিবীর সকল মুসলিমের সম্মানের পাত্র।
১০৩৭/৩৮ সালে নিশাপুর দখলে নিয়েই সুলতান তুগরিল বে আব্বাসি খলিফা আল ক্বাইম বিআমরিল্লাহর (১০৩১-১০৭৫) কাছে সালতানাতের স্বীকৃতি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।১০৪০ সালে দান্দানকানন যুদ্ধে বিজয়ী হলে অবশেষে আব্বাসি খলিফা সেলজুকদের খোরাসানের অধিপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন । খোরাসানে আব্বাসিদের প্রতিনিধি হিসেবে সেলজুকদের মেনে নিলেন তিনি।
আব্বাসিদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে সেলজুকরা মূলত খোরাসান জুড়ে অভিযান চালানোর পরোক্ষ অনুমতি পেয়ে গিয়েছিল।
তুগরিল বের ইরান বিজয়ের আকাঙ্খাকে একধাপ এগিয়ে দিল এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইরানের দক্ষিন ও পশ্চিমে উত্থান ঘটে যিয়ারিদ রাজবংশের।মারদাভিজ নামে একজন জরথুস্ত্রীয় রাজপুত্র যিয়ারিদ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।যদিও ৯৩৫ সালে মারদাভিজ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন।জুরজান,তিবরিস্তান,ইসফাহান ও রায়ের মত শহরগুলো ছিল যিয়ারিদদের অধীনে।১০০০ সালের পর হতে গজনভিদের ক্রমাগত হামলার মুখে যিয়ারিদরা তাদের ক্ষমতা হারাতে শুরু করে,তবে ১০২৫ সালে গজনভিদের সাথে শান্তিচুক্তি করে তারা।তাই মোটামুটি স্থিতিশীলতা ফিরে আসে ইরানের দক্ষিণ ও পশ্চিমে।
১০৩০ সালে যিয়ারিদদের সিংহাসনে আরোহন করেন আনুশিরভান শরফ আল মাআ'লি।দু বছরের মাথায় ১০৩২ সালে নিজের সেনাপ্রধান আবু কালিজার ইবনে ভাইহানের কাছে ক্ষমতা হারান তিনি।মূলত তখনই যিয়ারিদদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।সুলতান তুগরিল তখন থেকেই তাদের কার্যক্রম লক্ষ্য করছিলেন,যদিও তাদের দূর্বলতার সূযোগ তিনি নিতে পারেননি।
১০৪০ খ্রিস্টাব্দের কিছুদিন পরে সেনাপ্রধান আবু কালিজার কে আটক করতে সক্ষম হন আনুশিরভান,কিন্তু দীর্ঘ নয় বছরের গৃহযুদ্ধ যিয়ারিদ সেনাবাহিনীর শক্তি একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।
সুলতান তুগরিল এবার আর দেরি করেননি,১০৪১ সালে সাবেক গজনভি সেনাপতি মারদাভিজ বিন বাশুকে নিয়ে জুরজান ও তিবরিস্তান অভিমুখে এগিয়ে যান।যিয়ারিদ অধিপতি আনুশিরভান বুঝতে পেরেছিলেন সুলতান তুগরিলের সাথে লড়াই করার শক্তি তার নেই।
আনুশিরভান সুলতানের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিলেন।এভাবে কোন যুদ্ধ ছাড়াই ইরানের দুই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল অধিকার করে নিলেন সুলতান তুগরিল।সেলজুকদের সীমানা আরো বৃদ্ধি পেলো।
কারাখুম আর কিযিলকুম এ দু'মরুভূমির মধ্যখানে অবস্থিত খোয়ারিজম ছিল তৎকালীন খোরাসানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর।যদিও খোয়ারিজম বর্তমানে তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের অংশ কিন্তু ১০০০ খ্রিস্টাব্দে খোয়ারিজমকে বিবেচনা করা হতো বৃহত্তর ইরানের অংশ হিসেবে।জুরজান ও তিবরিস্তান বিজয়ের পরপরই সুলতান তুগরিল বে খোয়ারিজম বিজয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
খোয়ারিজম ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন নগরীসমূহের একটি।হাজারো বছর ধরে শত শত পরিবার এই নগরীকে শাসন করে আসছিল।সাসানিদ সাম্রাজ্য,আফ্রিগিদ সাম্রাজ্যের হাত হয়ে ৯৯৫ সালে মামুনিদদের অধীনে আসে খোয়ারিজম ও তদীয় পার্শ্ববর্তী অঞ্চল।কিন্তু মাত্র ২২ বছরের মাথায় ১০১৭ সালে গজনির সুলতান মাহমুদের কাছে খোয়ারিজম হারাতে হয় মামুনিদদের।যদিও খোয়ারিজমের ইতিহাসে শিক্ষা ও সংষ্কৃতির জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মামুনিদ শাসকরা।
যাই-হোক, গজনিদের অধীনে আসার পর খোয়ারিজমের গভর্নর হন বিখ্যাত সেনাপতি আলতুনতাশ।আলতুনতাশ ছিলেন গজনির একজন অনুগত গভর্নর।কিন্তু তার পুত্র হারুন স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন।তাই সুলতান মাসউদ আব্দুল জব্বার নামক এক উজিরকে হারুন হত্যার আদেশ দেন।হারুন ইবনে আলতুনতাশকে হত্যা করে খোয়ারিজমের গভর্নর হন আব্দুল জব্বার কিন্তু,হারুনের পুত্ররা তাকে হত্যা করে ফেলে।পরবর্তীতে সুলতান মাসউদের আদেশে খোয়ারিজমের গভর্নর হন জান্দের (উজবেকিস্তানের শহর) শাহ মালিক।
শাহ মালিক ইবনে আলি, ১০৩৩ সালের দিকে তার হাতেই অতর্কিত গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন সেলজুকরা।শাহ মালিক খোয়ারিজমের সিংহাসনে বসলে খোয়ারিজম বিজয়ের জন্য প্রতিজ্ঞা করলেন সুলতান তুগরিল।তাকে অতীতকর্মের শাম্তি দিতে চাচ্ছিলেন সুলতান।
এদিকে ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিদ্বন্দীদের হাতে সুলতান মাসউদ নিহত হলে গজনভি সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়।সুলতান তুগরিল এ বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে চাইছিলেন।অবশেষে ১০৪২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে খোয়ারিজম অবরোধ করেন সুলতান তুগরিল।বেশ কয়েকদিন অবরোধের পর শাহ মালিক পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।শাহ মালিকের অবৈধভাবে অর্জিত সমস্ত সম্পত্তি জব্দ করা হয়।সুলতান তুগরিল নিজ হাতে শাহ মালিকের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে চেয়েছিলেন,কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠেনি।তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেলজুকদের থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে।খোয়ারিজম বিজয়ের পরেও বেশ কয়েকটি সংঘর্ষে শাহ মালিক সেলজুকদের হাতে পরাজিত হয়েছিলেন।
কিরমান, আধুনিক ইরানের দক্ষিন-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত এই শহর ইরানের সবচেয়ে বৃহত্তর এলাকা।তৎকালীন যুগে এই কিরমানের আয়তন ছিলো আরো বিশাল।১০৪৪ সালে ৪৩৪ হিজরি নাগাদ সুলতান তুগরিলের ভাই ইব্রাহিম ইনাল সেনাবাহিনী নিয়ে কিরমানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
কিরমানের অধিপতি ছিলেন আবু কালিজার মারজুবান। তিনি ছিলেন বিখ্যাত শিয়া বুয়িদ সালতানাতের সুলতান সুলতানুদ্দৌলাহর সন্তান। পিতার মৃত্যুর পর ভাই জালাউদ্দৌলাকে সিংহাসনে বসায় রাজ্যের উজিররা। ফলে আবু কালিজার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন ও বুয়িদ সালতানাতের অধীনস্থ এলাকা দখল করতে শুরু করেন। এই ধারাবাহিকতায় ১০২৮ সালে কিরমান দখল করেছিলেন তিনি। আবু কালিজার ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ও দক্ষ শাসক, ইরাকের অধিকাংশ এলাকা ছিল তার দখলে।
যাইহোক, মালিক ইব্রাহিম ইনাল সেনাবাহিনী নিয়ে কিরমানে যাওয়ার পর শহরের বাইরে অভিযান চালাতে শুরু করেন তিনি। আশেপাশের ছোট ছোট দূর্গ, গ্রাম ও শহর গুলো দখলে নেওয়ার পর সেলজুকরা জিরাফ্ত নগরী দখল করতে এগিয়ে যান। সেলজুকদের আগমনের সংবাদ পেয়ে আবু কালিজার কিরমানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
অবশেষে জিরাফ্ত নগরীর কাছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুখোমুখি হয় সেলজুক ও আবু কালিজারের সেনাবাহিনী।সেলজুকদের কৌশল আর বীরত্বের কাছে হার মানতে বাধ্য হন আবু কালিজার মারজুবান।আবু কালিজার আত্মসমর্পণ করেন।অবশ্য পূর্বচুক্তি অনুসারে কিরমানের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন চাগরি বের বড় পুত্র কারা আরসালান কার্ভূট বে।তার নেতৃত্বেই কিরমানে গড়ে উঠেছিল স্বতন্ত্র সেলজুক সালতানাত,ইতিহাসে যারা কিরমানি সেলজুক নামে পরিচিত।
আধুনিক ইরানের তেহরান ও হামাদান প্রদেশের দুটি শহরের নাম রায় ও হামাদান।এগারোশো খ্রিস্টাব্দে এ শহর দুটি ছিল বুয়িদ শিয়াদের অধীনে।
সুলতান তুগরিল বে রায় ও হামাদান বিজয়ের জন্য দায়িত্ব দেন তার চাচাতো ভাই ইব্রাহিম ইনালকে।
১০৪৭সালে ইব্রাহিম ইনাল প্রথমে রায় ও পরবর্তীতে হামাদান শহর অবরোধ করেন।বেশ কয়েকদিন অবরোধের পর ইব্রাহিম ইনাল হামাদান দখল করতে সক্ষম হন।
১০৪৮সালে সুলতান তুগরিল রায় শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।ইব্রাহিম ইনাল সুলতানের হাতে রায় শহর তুলে দেন।
পরবর্তীতে রায় শহরকে নিজের রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন সুলতান তুগরিল।
১০০৮ সালে পশ্চিম ইরানে উত্থান ঘটে শিয়া কাকুয়িদ সালতানাতের।একসময় কুর্দিস্তান,পশ্চিম ইরান,জিবাল ইত্যাদি তাদের দখলে থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় তারা ইসফাহান,ইয়াজ্দ ও আবারকোহ এর দায়িত্ব গ্রহন করে।তারা মূলত শক্তিশালী শিয়া বুয়িদ সালতানাতের প্রতি অনুগত থাকত।
মধ্য ইরানের বৃহত্তম শহর ছিল ইসফাহান।ইরানের অধিকাংশ অঞ্চল বিজয়ের পর সুলতান তুগরিল ইসফাহান বিজয়ের সিদ্ধান্ত নেন।১০৪৮ সালে ইসফাহানের উপর কঠোর অবরোধ আরোপ করেন সুলতান।কয়েকদিন অতিবাহিত হলে ইসফাহানের তৎকালীন গভর্নর আবু মনসুর বিন আলাউদ্দৌলা সুলতানকে সন্ধির আবেদন জানান।বিনিময়ে বিশাল অংকের মুদ্রা আর ইসফাহানের জামে মসজিদে খোতবায় সুলতানের নাম পড়ার প্রস্তাব দেন তিনি।সুলতান তুগরিল সন্ধিতে রাজি হয়ে অবরোধ তুলে নেন।
কিন্তু, আবু মনসুর মোটেও আদর্শবান শাসক ছিলেন না।সুলতান তুগরিলের সাথে কৃত চুক্তিকে তোয়াক্কাই করতেন না তিনি। উপরন্তু,সেলজুকদের অন্যতম শত্রু শিয়া আব্দুর রহিম ইবনে আবু কালিজারের অনুগত ছিলেন তিনি।তাই সুলতান তুগরিল এবার ইসফাহান বিজয়ের শক্ত প্রতিজ্ঞা করলেন।তাই ১০৫২ সালের শুরুতে ইসফাহান অবরোধ করে বসলেন সুলতান তুগরিল। প্রায় একবছর ধরে ইসফাহান অবরোধ করে রাখতে হলো সুলতানের।একসময় যখন ইসফাহানের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেল,জনগনের জমিয়ে রাখা রসদ ফুরিয়ে গেল,আবু মনসুর ইবনে আলাউদ্দৌলা সুলতানের কাছে আত্নসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন।অবশ্য এই একবছরে আবু মনসুরের সাথে বেশ কয়েকবার যুদ্ধে জড়িয়েছিল সেলজুক সেনাবাহিনী।
অবশেষে সুলতান ৪৪২ হিজরির মুহাররম মাস মোতাবেক ১০৫৩ সালে ইসফাহানে প্রবেশ করেন সুলতান তুগরিল।
এছাড়াও ১০৫৫ সাল নাগাদ ইরানের কাজভিন,বিলাদুল জিবাল ও আবহার এবং আজারবাইজানের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নেন সুলতান তুগরিল বে।সেলজুকরা ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজপরিবারে পরিণত হয়।
ইরান বিজয়ের পর সুলতান তুগরিল এবার দৃষ্টি ফেললেন শিয়া অধ্যুষিত ইরাকে, আব্বাসি খেলাফতের রাজধানী বাগদাদের দিকে.......
১ঃ—আল কামিল ফিত তারিখ/ অষ্টম খন্ড
২ঃতারিখুজ সালাজিকা/ ড.মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
৩ঃতারিখু সালাজিকাতুর রুম/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৪ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজু'ক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
৫ঃতারিখুস সালাজিকাহ্ ফি ইরান ওয়া ইরাক ওয়া খুরাসান/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৬ঃThe Great Seljuk Empire / A.C.S Peacock
সৌজন্যেঃ Devlet-E Alia-E Usmania
সুলতান তুগরিল বে---------------ষষ্ঠ পর্ব
খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ পানে.......
ইতিহাসের পাতায় তখন ৮৯১/৯২ খ্রিস্টাব্দ।কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিন-পশ্চিম তীরবর্তী উত্তর ইরানে এক জেলের ঘরে জন্ম হয় আবু আলি বুয়াহে্র।কিন্তু,কে জানতো যে,তিনিই একদিন আব্বাসি খিলাফতের রাজধানী দখল করে বসবেন!ইরানের যুদ্ধবাজ গোষ্ঠী দায়লামি গোত্রের সন্তান ছিলেন তিনি।তার অপর দু'ভাইয়ের নাম আহমদ বুয়াহ্ ও হাসান বুয়াহ্।আবু আলি বুয়াহ্ ও তার ভাইয়েরা ছিলেন জ্ঞানী,সাহসী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি।তাদের আচার-ব্যবহার ও নৈতিকতায় মুগ্ধ হয়ে মানুষ তাদের মান্য করতো,ভালোবাসত ও তাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল।আবু আলি বুয়াহ্ ছিলেন তিনভাইয়ের মধ্যে অগ্রগণ্য।
যৌবনের শুরুতেই আবু আলি বুয়াহ্ প্রথমে শিয়া সামানিদ শাসক "নাসির দ্বিতীয়”ও পরবর্তীতে গুরুগঞ্জ ও রায়ের শাসক মাকান ইবনে কাকির সেবায় নিয়োজিত হন।তখন অপর দু'ভাই নিজেদের উদ্যোগে সেনাবাহিনী গঠনের চেষ্টা করছিলেন।
৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইরানে উত্থান ঘটে যিয়ারিদ রাজবংশের।তখন আবু আলি বুয়াহ্ যিয়ারিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মারদাভিজ ইবনে যিয়ারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন ও আধুনিক ইরানের ”বাহরামাবাদের” নিকট "কারজ" নামে একটি ছোট্ট শহরের দায়িত্ব লাভ করেন।
এদিকে বিদ্বান ও বুদ্ধিমান আবু আলি বুয়াহে্র জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলে মারদাভিজ ইবনে যিয়ার তাকে নিজের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করলেন ও গোপনে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিলেন।কিন্তু,আবু আলি বুয়াহ্ আগেই জেনে গেলেন ও ভাইদের নিয়ে সর্বপ্রথম কারজ শহর দখল করে নিলেন।
৯৩৫ সালে পথের কাটাঁ মারদাভিজ ইবনে যিয়ার গুপ্তহত্যার শিকার হলে আবু আলি বুয়াহ্ ও তার ভাইদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ইরানের রায়,ইসফাহান,হামাদান ও বিলাদুল জিবাল, আর ইরাকের শহরগুলো একে একে বুওয়াহিদদের কাছে পদানত হল।
কিন্তু,আবু আলি বুয়াহ্ ছিলেন বুদ্ধিমান ব্যক্তি।তিনি প্রথমেই নিজকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষনা দেননি।বরং তার বিজিত সমস্ত অঞ্চল তিনি আব্বাসি খলিফার অনুগত হিসেবে শাসন করতে লাগলেন।খলিফা তাকে এসব অঞ্চল শাসনের অধিকার দিয়েছিলেন।কিন্তু,তার আসল লক্ষ্য ছিল আরো বড় এবং সূদুরপ্রসারী।তিনি বড় লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ধৈর্য ও শক্তি জোগাড় করছিলেন।
খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে প্রবেশঃ
খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ ও ইরাকের অবস্থা তখন অস্থিতিশীল।খেলাফতের আমির-উমারা বিশেষ করে বসরার আমির ইবনে রাঈক ও আবু আব্দুল্লাহ বারিদির মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারষ্পরিক ষড়যন্ত্র বাগদাদকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল।উপরন্তু,দূর্নীতি ও খলিফার ইচ্ছেমতো উপঢৌকন দেওয়ার রীতি রাজকোষ একেবারে খালি করে ফেলেছিল।বাগদাদের জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল ক্রমে ক্রমে।
বাগদাদের এই নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোন একটা শক্তিশালী কতৃপক্ষের দরকার ছিল,যারা বাগদাদকে নতুন ধাঁচে গড়ে তুলবে।আবু আলি বুয়াহ্ এই সুযোগের-ই অপেক্ষায় ছিলেন।মেঝ ভাই আহমদ ইবনে বুয়াহ্ কে বাগদাদের উদ্দেশ্যে পাঠালেন।অবশেষে খলীফা মুসতাকফি বিল্লাহর (৯৪৪-৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ ) আমলে ৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি আহমদ ইবনে বুয়াহ্ বাগদাদে প্রবেশ করেন।খলিফার হাতে বায়আত গ্রহন করে তিনি ”মুইজ উদ্ দাওলাহ্ (রাষ্ট্রের সর্বসম্মানি ব্যক্তি)”খেতাব নেন।অপর দু'ভাই আবু আলি বুয়াহ্ কে ”ইমাদ উদ্ দাওলাহ্” ও হাসান ইবনে বুয়াহ্ কে ”রুকন্ উদ্ দাওলাহ্” উপাধি দেওয়া হয়।এর মাধ্যমেই পুরো ইরাক ও ইরান জুড়ে বুওয়াহিদ সালতানাতের গোড়াপত্তন হয়।স্বয়ং খলিফা তাদের ক্রীড়ানকে পরিনত হলেন।খলিফার হাতে কোন ক্ষমতা'ই আর বাকি রইলো না।পুরো আব্বাসি খিলাফত চলে গেল বুওয়াহিদদের হাতে.........
দায়লামি জনগোষ্ঠীর মতই বুওয়াহিদরা ছিল শিয়া। প্রথমে তারা "যাইদি" শিয়া থাকলেও পরবর্তীতে শিয়াদের মূল দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। যারা বার ইমাম কে মান্য করতো। বাগদাদে প্রবেশের পর তারা শিয়াবাদের প্রচার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।ঐতিহাসিক ইবনুল আসির তার অমর গ্রন্থ ”আল কামিল ফিত তারিখে”৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,মুইজ উদ দাওলাহ বাগদাদের প্রতিটি মসজিদে তিন খলিফা ও হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এর নামে বদদোয়া করার নির্দেশ জারি করেছিল।এত নিকৃষ্ট কাজ করার পরও তাকে বাঁধা দেওয়ার সাধ্য খলিফার ছিল না।আবু আলি বুয়াহ্ আশুরার দশ তারিখে তাজিয়া মিছিল করার নির্দেশ দিয়েছিল।খেলাফতের প্রধান প্রধান পদগুলোতে বসানো হয়েছিল খ্রিস্টান আর ইহুদি ধর্মালম্বী লোকদের।বাইজান্টাইনদের বিরূদ্ধে জিহাদ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল বুওয়াইহিদ রা।
এমনকি মুইজ উদ দাওলাহ্ র নির্দেশে খলিফা মুসতাকফি বিল্লাহকে পদচ্যুত করা হয়েছিল,তাকে টেনে হিঁচড়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় ও মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কারাগারেই ছিলেন।
এভাবে খলিফার নিয়োগ-বিয়োগ তাদের একান্ত ইচ্ছার উপর নির্ভর করত।তাদের খুশী করেই একজন আব্বাসি রাজপুত্র সিংহাসনে বসতে পারতেন।তাদের ইশারায় এককালের প্রতাপশালী আব্বাসি খিলাফতের সিংহাসন নড়ে উঠতো। এ অপদস্থতা আর অপমান নিয়েই দিনাতিপাত করছিল আব্বাসি খলিফাগণ।এর সাথে ইসলামের মূল শিক্ষাকে মুছে ফেলার চেষ্টায় ছিল বুওয়াহিদ শিয়ারা।
৯৪৫ থেকে ১০৫৫ খ্রিস্টাব্দ,দীর্ঘ একশো দশ বছর কেটে গেলো এভাবে।এর মাঝে উত্থান ঘটলো খাঁটি সুন্নি মুসলিম ও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার অধিকারী সেলজুকদের।১০৪০ থেকে ১০৫৫ পর্যন্ত সুলতান তুগরিল প্রথমে ইরান থেকে বুওয়াহিদদের তাড়ালেন।পুরো ইরান যখন নিজের করায়ত্তে চলে আসল,সুলতান তুগরিল এবার বাগদাদের দিকে নজর দিলেন।শিয়াদের কাছ থেকে মুসলিমদের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদ উদ্ধার করতে মনস্থ করলেন তিনি।
১০৫৫ সালে হজ্বে যাওয়ার নিয়ত করেছিলেন সুলতান।সুলতানের ইচ্ছা ছিলো মক্কা পর্যন্ত পুরো রাস্তা হাজ্বীদের জন্য নিরাপদ করে গড়ে তুলবেন,তারপর মিশর ও সিরিয়া থেকে শিয়া ফাতিমিদের তাড়িয়ে দিবেন।
প্রথমে সুলতান খলিফার সাথে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।পরিকল্পনা অনুসারে ১০৫৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর খলিফা আল ক্বাইম বিআমরিল্লাহ র(১০৩১-১০৭৫) নির্দেশে সুলতান তুগরিল বে ষাট হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে বাগদাদে প্রবেশ করেন।সুলতানের বিরাট বাহিনীর ভয়ে শিয়া বুওয়াহিদরা পালিয়ে যায়।শিয়াদের আমির মালিক আব্দুর রহিমকে আটক করা হয়।বাগদাদজুড়ে পুনরায় সুন্নি ইসলামের প্রতিষ্ঠিত হয়,মসজিদের দেয়ালে সাহাবিদের সম্পর্কে লেখা কুরুচিপূর্ণ বাক্যগুলো মুছে ফেলা হয়।দীর্ঘ একশ দশ বছর পর শিয়ামুক্ত হলো বাগদাদ।
খলিফা সুলতান তুগরিলের সম্মানার্থে জুমুআ'র খোতবায় তার নামের পর সুলতানের নাম উচ্চারণের আদেশ জারি করেন।সেলজুকদের দখলকৃত সমস্ত ভূখণ্ডের উপর স্বাধীনভাবে শাসন চালানোর অনুমতি দেন খলিফা।খলিফা সুলতান তুগরিলকে যথেষ্ট সম্মান করতেন ও সকল বিষয়ে তার পরামর্শ মেনে চলতেন।এভাবে আব্বাসি ও সেলজুকদের মাঝে গড়ে উঠল পিতা-পুত্রের ন্যায় আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ গভীর সম্পর্ক।
আল বাসাসিরির বিদ্রোহ ও পুনরায় বাগদাদ বিজয়ঃ
আবুল হারিথ আরসালান আল মুজাফফর আল বাসাসিরি,তিনি একজন তুর্কি মামলুক কমান্ডার ছিলেন।শিয়া বুওয়াহিদদের অধীনে আল বাসাসিরি একজন ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী সেনাপ্রধানে পরিনত হন।বুওয়াহিদ সুলতান মালিক আব্দুর রহিমের শাসনামলে আল বাসাসিরি বাগদাদের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব লাভ করেন।
১০৫৫ সালের ডিসেম্বরে সুলতান তুগরিল যখন বাগদাদ বিজয় করেন,আল বাসাসিরি সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করেন ও বাগদাদ পুনরুদ্ধারের জন্য কায়রোর শক্তিশালী ফাতেমি খলিফার কাছে সাহায্য চান।ফাতেমি খলিফা আল বাসাসিরি কে ৫ লাখ দিনার,১০ হাজার ধনুক,১ হাজার তরবারি ও পাঁচশো ঘোড়া সাহায্য হিসেবে পাঠান।সিরিয়া ও ইরাকের বহু আমির ফাতেমি খলিফার নির্দেশে আল বাসাসিরির পতাকাতলে জড়ো হয়।১০৫৭ সালের জানুয়ারিতে আল বাসাসিরি প্রথমে সুলতান তুগরিলের চাচাত ভাই কুতুলামিশকে পরাজিত করেন ও উত্তর ইরাকের সিনজার নগরী দখল করে নেন।এর কিছুদিন পর দখল করেন ইরাকের অন্যতম প্রধান শহর মসুল।মসুলে ফাতেমি খলিফার নামে খোতবা জারি করেন তিনি।
আল বাসাসিরির মসুল বিজয়ের সংবাদ শুনে আব্বাসি খলিফা আল ক্বাইম বিআমরিল্লাহ সুলতান তুগরিল কে মসুল বিজয়ের নির্দেশ দেন।১০৫৭ সালে সুলতান তুগরিল বে বাগদাদ থেকে মসুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।মসুলে পৌঁছে সুলতান বাসাসিরি কে পরাজিত ও দামেস্ক পালিয়ে যেতে বাধ্য করেন।সুলতান তুগরিল চাচাতো ভাই ইব্রাহিম ইনালকে মসুলের দায়িত্ব দিয়ে বাগদাদ ফিরে আসেন।
ওদিকে ইব্রাহিম ইনাল ছিলেন চরম ক্ষমতালোভী ব্যক্তি।সুলতান তুগরিলের সিংহাসন দখলে নেওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তিনি।ধূর্ত আল বাসাসিরি ইব্রাহিম ইনালের মনোভাবের বুঝতে পেরেছিলেন আগেই।তিনি ইব্রাহিম ইনালকে সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উস্কে দেন ও সর্বপ্রকারের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।বিনিময়ে ইব্রাহিম ইনালকে মসুল ছেড়ে দিতে রাজি করান তিনি।
পরিকল্পনা মতো ১০৫৮ সালের শেষের দিকে ইব্রাহিম ইনাল আল বাসাসিরির কাছে মসুল ছেড়ে সেলজুক রাজধানী রায়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।এ সংবাদ শুনে সুলতান তুগরিল তড়িঘড়ি করে বাগদাদ ত্যাগ করেন ও রায় শহরের কাছে ইব্রাহিম ইনালের সাক্ষাৎ পান।
সুলতান তুগরিল ও ইব্রাহিম ইনাল যখন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন,সেলজুক সেনাবাহিনী যখন একে অপরকে হত্যা করতে উদ্যত হচ্ছিল,ঠিক তখনই আল বাসাসিরি এক ফাঁকে বাগদাদ পুনরুদ্ধার করে ফেললেন।১০৫৯ সালের ৮ জানুয়ারি আল বাসাসিরি বাগদাদে প্রবেশ করেন।
বাগদাদ বিজয় করে আল বাসাসিরি এবার আব্বাসি খলিফাকে একেবারে ছুড়ে ফেললেন।বাগদাদের সমস্ত মসজিদে শিয়া ফাতিমি খলিফা আল মুসতানসির বিল্লাহর নামে খোতবা জারি করলেন।বাগদাদকে ফাতিমি খিলাফতের অংশ বলে ঘোষনা করা হলো।অসহায় আব্বাসি খলিফার তরফ হতে আবারো সুলতানের ডাক পড়লো.......
সুলতান তুগরিলের বাগদাদ পুনরুদ্ধারঃ
সুলতান যখন ভাইয়ের সাথে লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন,শিয়াদের হাতে পুনরায় বাগদাদ পতনের সংবাদ পেলেন তিনি।রাগে-ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন তিনি।১০৫৯ সালের জুলাইয়ে রায় শহরের কাছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইব্রাহিম ইনালকে পরাজিত করেন সুলতান তুগরিল।তার সাথে ছিলেন চাগরি বের পুত্র আল্প আরসালান,কার্ভূট বে ও কুতুলামিশ।সকলের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে ইব্রাহিম ইনালকে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছিল।
এর পূর্বেও ইব্রাহিম ইনাল সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন,কিন্তু সুলতান তখন ইব্রাহিমকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।তবে এবার আর ক্ষমা করলেন না।ধনুকের ছিলা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলো ইব্রাহিম কে।
তারপর সুলতান তুগরিল পুনরায় বাগদাদ দখল করা আল বাসাসিরি কে বাগদাদ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।আল বাসাসিরি সুলতানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।কিন্তু,সুলতান যখন তার সেনাবাহিনী নিয়ে বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন,আল বাসাসিরি ভয়ে বাগদাদ ত্যাগ করেন।১০৫৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাসাসিরি তার পরিবার নিয়ে বাগদাদ থেকে পালিয়ে যান।
এর কিছুদিন পরেই ১০৬০ সালের ৪ জানুয়ারি সুলতান তুগরিল ও খলিফা বাগদাদে প্রবেশ করেন।
আল বাসাসিরি ইরাকের কুফার দিকে পালিয়ে যান।কিন্তু,খলিফা তার মাথা চেয়েছিলেন। তাই সুলতান তুগরিল আল বাসাসিরির পেছনে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন।পরিশেষে ১০৬০ সালের ১৫ জানুয়ারি কুফার ”সাকি আল ফুরাতে” সেলজুক অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে এক যুদ্ধে পরাজিত হলেন তিনি।তিনি বন্দী হলে তার মাথা কেটে পাঠানো হল খলিফা আল ক্বাইম বিআমরিল্লাহ্ র কাছে .....
এভাবেই বাগদাদ মুক্ত হলো নিকৃষ্ট শিয়াদের হাত থেকে।সুলতান তুগরিল আর সেলজুকরা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিলেন শিয়াদের হাত থেকে বাগদাদ পুনরুদ্ধার করার জন্য......
১ঃ—আল কামিল ফিত তারিখ/ অষ্টম খন্ড
২ঃতারিখুজ সালাজিকা/ ড.মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
৩ঃতারিখু সালাজিকাতুর রুম/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৪ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজু'ক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
৫ঃতারিখুস সালাজিকাহ্ ফি ইরান ওয়া ইরাক ওয়া খুরাসান/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৬ঃThe Great Seljuk Empire / A.C.S Peacock
7ঃ The Great Seljuk/ Aziz Basan
সৌজন্যেঃ Devlet-E Alia-E Usmania
সুলতান তুগরিল বে---------------সপ্তম পর্ব
[বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে সংঘাত]
১০৪০ সালের ২৩ মে দান্দানকানন যুদ্ধে বিজয়ের পর সুলতান তুগরিল বে ইরান বিজয়ের অভিযানে নামেন।খ্রিস্টান রাজ্য আরমেনিয়া ছিল ইরান ও আজারবাইজানের পাশে।সেলজুকরা ধীরে ধীরে ইরান ও আজারবাইজান অধিকার করলে আরমেনিয়ার সাথে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠে।কারন,সেলজুকরা বসে থাকার লোক ছিল না।জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বাস্তবায়নে তারা তৎপর থাকতো সবসময়।তাই আর্মেনিয়া অধিকার করা ছিল তাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ।
১০৪৫ সালে আজারবাইজান সীমান্তবর্তী আর্মেনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল আনি দূর্গ ও ভাসপুরাকান দখল করে নেয় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য।
ফলে সরাসরি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে সেলজুকদের লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠে।
হাসান ইবনে মুসা ইয়াবগুর অভিযান ও শাহাদাতঃ
১০৪৭ সালের শেষের দিকে সুলতান তুগরিলের চাচাতো ভাই,মুসা ইয়াবগুর ছেলে হাসান প্রথমবারের মত আজারবাইজান সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভাসপুরাকানের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যান।হাসান ছিলেন বয়সে তরুণ ও তার সৈন্য সংখ্যাও ছিল নেহায়েত কম।
হাসান বিন ইয়াবগুর অভিযানের সংবাদ পেয়ে বাইজান্টাইন গভর্নর কাটালন কেকামেনোস সৈন্য জড়ো করে আর্মেনিয়ার বিখ্যাত হৃদ ”লেক ভ্যানে”র পূর্ব দিকে এগিয়ে যান।লেক ভ্যানের পূর্বে স্ট্রাগনা নদীর তীরে উভয় সেনাবাহিনী মুখোমুখি হয়।ঘন্টাব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সেলজুকদের পিষে ফেলে বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী।হাসান ইবনে ইয়াবগু শহিদ হয়ে গেলে সেলজুকরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
১০৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সংঘটিত হওয়া ক্যাপেট্রান যুদ্ধকে সেলজুক-বাইজান্টাইন প্রথম যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।ছ'মাস আগে স্ট্রাগনা নদীর যুদ্ধে বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীর হাতে হাসান ইবনে মুসা ইয়াবগু শহিদ হলে সুলতান তুগরিল বে ও সেলজুক রাজপরিবারের সদস্যরা চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়।সুলতান তুগরিল,বড় ভাই চাগরি বে সহ সকলেই আনি ও ভাসপুরাকানে অভিযান চালাতে চাচ্ছিলেন।প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ছিলেন তারা।সে প্রেক্ষিতেই ক্যাপেট্রান যুদ্ধের সূচনা।
১০৪৮ সালের মার্চ/এপ্রিল মাসের শেষের দিকে সুলতান তুগরিলের চাচাতো ভাই ইব্রাহিম ইনাল আনুমানিক বিশ হতে পঞ্চাশ হাজার সেনা নিয়ে সেলজুকদের সামরিক ঘাঁটি তাবরিজ ত্যাগ করেন।ইব্রাহিম ইনাল আর্মেনিয়ার সীমান্তবর্তী ”আরাস” নদীর তীর ধরে প্রথমে ভাসপুরাকানে প্রবেশ করেন।তারপর সেলজুক সেনাবাহিনী দক্ষিনে ট্রেবিজোন্ড (আধুনিক তুর্কি শহর),চালাদিয়া,থেরন,বাসিন ও আর্টজ শহরের দিকে এগিয়ে যায়।উপরন্তু সেলজুকরা আর্টজ শহরটি অবরোধ করে ও বহু খ্রিস্টান সৈন্যকে হত্যা করা হয়।
বাইজান্টাইন গভর্নর কেকামেনোস সেলজুকদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন।কিন্তু,ভাসপুরাকানের সেনাপ্রধান অ্যারন কেকামেনোস কে বহুকষ্টে অভিযান থেকে নিবৃত্ত করলেন।কারন,ভাসপুরাকান ও আনি দূর্গের অধীনস্ত সেনাদের নিয়ে সেলজুকদের প্রতিরোধ করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল।তাই সেনাপ্রধান অ্যারন বাইজান্টাইন সম্রাট নবম কন্স্টান্টিনের কাছে সেনাসাহায্য চাইলেন।
বাইজান্টাইন সম্রাট আর্মেনিয়ার পার্শবর্তী রাজ্য কিংডম অব জর্জিয়াকে ভাসপুরাকানকে সাহায্য করতে আহ্বান জানালেন।সম্রাটের আহ্বান শুনে সেলজুকদের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসলেন জর্জিয়ার যুবরাজ ডিউক চতুর্থ লিপারিট।বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীর সেনাসংখ্যা পঞ্চাশ হতে সত্তুর হাজারে পৌঁছাল।
১০৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাপেট্রানে (উত্তর পূর্ব তুরস্কের আধুনিক পাসিনলার) মুখোমুখি হয় দু সেনাবাহিনী।
সেলজুক সেনাবাহিনীর মধ্যভাগে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শাহজাদা ইব্রাহিম ইনাল, তার ডানে ছিলেন খোরাসানি কমান্ডার চেরোসেন্তোস ও বামে ছিলেন দায়লামি কমান্ডার আসপার সালারিওস।
অন্যদিকে বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীর ডানে-বামে ছিলেন গভর্নর কেকামেনোস ও সেনাপ্রধান অ্যারন।আর জর্জিয়ার যুবরাজ চতুর্থ লিপারিট কেন্দ্র থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঘন্টাখানেকের মধ্যে সেলজুক সেনাবাহিনীর ডানবাহু পরিপূর্ণ ধ্বংস করে দেন গভর্নর কেকামেনোস।ডান বাহুর খোরাসানি কমান্ডার চেরোসেন্তোস কে হত্যা করা হলে ডানবাহু ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।সেলজুক সেনারা কাতারে কাতারে শহিদ হচ্ছিল আর শহিদ হওয়ার আগে দু-তিনজন করে খ্রিস্টান সেনা হত্যা করছিল তারা।কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো আলামত-ই দেখা যাচ্ছিল না।এরমধ্যে বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীর রিজার্ভ সেনারা উপস্থিত হলে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে সেলজুকরা,নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছিল তারা।
কিন্তু, যুবরাজ লিপারিট হঠাৎ করেই ঘোড়া থেকে পড়ে যান,সাথে সাথে তাকে আটক করে ফেলেন ইব্রাহিম ইনাল।
বাইজান্টাইনদের কেন্দ্রীয় কমান্ডার আটক হয়ে গেলে খ্রিস্টান সেনারা হকচকিয়ে গেলো।তাকে বাচাঁতে কেকামেনোস ও অ্যারন যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হলেন।যুবরাজের গলায় তরবারি দেখে পিছিয়ে যেতে হলো বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী কে।
সেলজুকরা এ যুদ্ধে বহু ধনসম্পদ গনিমত হিসেবে লাভ করতে পারলেও প্রচুর পরিমানে সেনা হারাতে হয় তাদের।অপরদিকে বাইজান্টাইনদেরও জয়ের কাছাকাছি গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছিল।
তাই এ যুদ্ধে সত্যিকারের কোনো বিজয়ী ছিলো না।সেলজুকরা কৌশলগত সাফল্য অর্জন করলেও প্রকৃত বিজয় তাদের অধরাই থেকে গেলো।
সুলতান তুগরিলের অভিযান [১০৫৪ খ্রিস্টাব্দ]
১০৫৪ সালে বাইজান্টাইন সম্রাট নবম কন্স্টান্টিন মারা গেলে উত্তরাধিকার নিয়ে সাম্রাজ্যে গোলযোগ শুরু হয়।সুলতান তুগরিল বে এ পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।তাই ১০৫৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সুলতান তুগরিল তার সেনাবাহিনী নিয়ে আর্মেনিয়ার ভেতর ঢুকে পড়েন।তৎকালীন আর্মেনুয়ার "বেবুর্ট",ও ”পারকি" আধুনিক ”মুরাদিয়ে” শহর দখল করেন।তারপর
সেলজুক সেনাবাহিনী মানযিকার্ট শহর অবরোধ করে।প্রায় মাসখানেক ধরে মানযিকার্ট অবরোধ করে রাখেন সুলতান তুগরিল।কিন্তু,মানযিকার্টের অধিপতি বাসিলিয়াস ছিলেন বেশ সাহসী ও বুদ্ধিমান সেনাপতি।বাসিলিয়াস সেলজুক বাহিনীর উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদের অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য করেন।মানযিকার্টে অবরোধ ব্যর্থ হলে সুলতান তুগরিল বে পুনরায় আজারবাইজানে ফিরে আসেন।
সেলজুকদের আর্মেনিয়া বিজয়ের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেলেও মূলত এই যুদ্ধ-ই পরবর্তীতে বিখ্যাত মানযিকার্ট যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
আর্মেনিয়া অভিযানের মৌলিক কারনঃ
ইরান-আজারবাইজান সীমান্তে অবস্থিত হলেও সেলজুকদের আর্মেনিয়া অভিযানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ সক্রিয় ছিল।
"তারিখু সালাজিকাতুর রুম" গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ সুহাইল তাক্কুশ আর্মেনিয়া অভিযানের পেছনে সেলজুকদের বেশ কয়েকটি সক্রিয় কারণের কথা আলোচনা করেছেন।
১–ধর্মীয় নীতিঃ- মুসলমান মাত্রই জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ র বিশ্বাসে বিশ্বাসী।জিহাদের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও ইসলামি ভূমি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জীবন দিতে মরিয়া থাকে মুসলিমরা।খাঁটি ইসলামি আদর্শে উজ্জীবীত সেলজুক সেনাবাহিনী ও সুলতান তুগরিল বে'ও সেই আদর্শ আর বিশ্বাসে বলিয়ান ছিলেন।তাই সুলতান তুগরিল আর্মেনিয়া বিজয় করতে চাচ্ছিলেন,যাতে সেখানে আল্লাহর দ্বীনের পতাকা উড্ডীন হয়।অমুসলিমরা যেন ইসলামের শীতল ছায়ায় জড়ো হতে পারে,সে উদ্দেশ্যেই সুলতান আর্মেনিয়া বিজয় করতে চাচ্ছিলেন।
২–অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যঃ আর্মেনিয়া অভিযানের পেছনে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল আরো বড় একটি কারন।সেলজুকরা ইরান ও ইরাকে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো থেকে তুর্কিরা এখানে বসতি স্থাপন আরম্ভ করেছিল।কারন,ইরান ও ইরাক তুর্কিদের জন্য নিরাপদ বাসস্থানে পরিণত হয়েছিল।এত বিশাল সংখ্যক লোকজনের খাদ্যের জোগান দেওয়া ও তাদের পশুপালের জন্য চারণভূমি নির্ধারন করা বেশ কষ্টকর ছিল।তাই অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক সচ্ছল আর্মেনিয়া সেলজুকদের প্রথম পছন্দ ছিল।ইবনে কাসির তার বই "আল কামিল ফিত তারিখ" এ লিখেছেন,”শাহজাদা ইব্রাহিম ইনাল সুলতান তুগরিলকে বলেছিলেন,সুলতান!ওগুজ (তুর্কি) লোকেরা দল বেঁধে আমাদের ভূখণ্ডে আসছে,আমাদের ভূখণ্ড তো তাদের জায়গা দিতে পারছেনা।সুলতান তুগরিল তাদের বললেন, তোমরা খ্রিস্টান দেশগুলোতে যাও,জিহাদ করো আর গণিমত অর্জন করো।”
৩ঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যঃ আর্মেনিয়া অভিযানের পেছনে সুলতানের বেশ শক্তিশালী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল।১০৪৫ সালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য আর্মেনিয়া দখল করার পূর্ব পর্যন্ত আর্মেনিয়ার সাথে সেলজুকদের বিরোধ ছিল না।বাইজান্টাইনরা দখলে নেওয়ার পরই সেলজুকরা আর্মেনিয়া অভিযানের কথা ভাবতে থাকে।
এদিকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও শিয়া ফাতেমি সাম্রাজ্যের মাঝে বেশ উষ্ণ সম্পর্ক ছিল।কনস্টান্টিনোপলের জামে মসজিদে ফাতেমি খলিফার নামেই দোয়া করা হতো।সুলতান তুগরিল প্রথমে বাইজান্টাইন সম্রাটের সাথে চুক্তি করে মিশর ও সিরিয়া জয় করতে চেয়েছিলেন।কারন,মিশর ও সিরিয়া পৌঁছতে বাইজান্টাইন রোড ব্যবহার করতে হত।কিন্তু,সম্রাট নবম কন্স্টান্টিন সুলতান তুগরিলের এ চুক্তি ফিরিয়ে দেন।সে প্রেক্ষিতেই ১০৫৪/৫৫ সালে সুলতান আর্মেনিয়ার ভেতরে ঢুকে অভিযান চালিয়েছিলেন।পরবর্তীতে বাইজান্টাইন সম্রাট
সুলতানের সাথে চুক্তি করেন ও কন্স্টান্টিনোপলের জামে মসজিদে আব্বাসি খলিফা ও সুলতানের নামে খোতবা পড়ার অনুমতি দেন।খোতবা থেকে ফাতেমি খলিফার নাম বাদ দেওয়া হয়।
১০৬৩ সালে সুলতান তুগরিল বের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেলজুকরা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিল।বিশেষ করে সুলতানের চাচাত ভাই কুতুলামিশ ইবনে আরসালান ইসরাইল এসব অভিযানে নেতৃত্ব দেন।কুতুলামিশের বাহিনী আধুনিক তুরষ্কের সিভাস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।কিন্তু,আর্শ্চর্যের বিষয় হচ্ছে সেলজুকরা এসব ভূমিতে স্থায়ী হতে চায়নি মোটেও।বরং গণিমত সংগ্রহ করে বারবার ফেরত এসেছিল তারা।
তবে পরবর্তীতে কুতুলামিশের পুত্র সুলাইমান আর চাগরি বের পুত্র আল্প আরসালান স্থায়ীভাবে বাইজান্টাইন ভূখন্ড বিজয় করতে শুরু করেন।
১ঃ—আল কামিল ফিত তারিখ/ অষ্টম খন্ড
২ঃতারিখুজ সালাজিকা/ ড.মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
৩ঃতারিখু সালাজিকাতুর রুম/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৪ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজু'ক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
৫ঃতারিখুস সালাজিকাহ্ ফি ইরান ওয়া ইরাক ওয়া খুরাসান/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৬ঃThe Great Seljuk Empire / A.C.S Peacock
7ঃ The Great Seljuk/ Aziz Basan
সুলতান তুগরিল বে---------------অষ্টম পর্ব
খলিফার কন্যার সাথে বিবাহঃ
১০৬০ সালের জানুয়ারি মাসে শিয়া বুওয়াহিদদের হাত থেকে চুড়ান্তভাবে বাগদাদ বিজয়ের পর সুলতান তুগরিল খলিফার কন্যা সাইদা খাতুনকে বিবাহ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সুলতান তুগরিল বে তার উজির আবু নাসর কুন্দুরিকে দিয়ে খলিফা আল ক্বাইম বিআমরিল্লাহ'র কাছে প্রস্তাব পাঠান। খলিফা বেশ কিছুদিন ধরে এ ব্যাপারে চুপ থেকেছিলেন, কারন আব্বাসিদের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত কোন অনারবিয় শাসক রাজকন্যাকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু শেষপর্যন্ত খলিফা তুগরিল বেকে না করতে পারলেন না।
অবশেষে ১০৬২ সালের আগস্টে ইরানের তাবরিজ শহরে একলক্ষ দিরহাম মোহরানার বিনিময়ে সুলতান তুগরিল খলিফা-কন্যা সাইদা খাতুনকে বিবাহ করেন।
এছাড়াও ১০৬০ সালে সুলতানের বড় ভাই চাগরি বে মারা গেলে সুলতান তার বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করেন।যিনি চাগরি বের পুত্র শাহজাদা সুলাইমানের মাতা ছিলেন।তবে সুলতানের প্রথম স্ত্রী ছিলেন আলতুনজান হাতুন,যাকে সুলতান পুরো জীবন জুড়ে ভালোবেসেছিলেন।
কিন্তু,মহান আল্লাহ সুলতানের ভাগ্যে কোন ছেলে বা মেয়ে সন্তান রাখেননি।তাই মৃত্যুর পূর্বে চাগরি বের পুত্র শাহজাদা সুলাইমানকে পরবর্তী সুলতান হিসেবে মনোনীত করে যান সুলতান তুগরিল বে।
পূর্ব-পশ্চিমের প্রথম তুর্কি সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনঃ
সুলতান তুগরিল ছিলেন প্রচন্ড আত্নবিশ্বাসী ও সাহসী সেনানায়ক।তার তেজোদৃপ্ত আহ্বান ও শক্তিশালী বাহুবলে মুগ্ধ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তুর্কি গোত্রের লোকেরা তার পতাকা তলে দাড়িয়েছিল।তাদের নিয়েই মৃত্যুর আগে তিনি নিজ হাতে খোরাসান,ইরান ও ইরাকের উত্তর পূর্বাঞ্চল নিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে যান।
তিনিই সেলজুক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেছেন,সেলজুক সাম্রাজ্যের খুঁটিকে শক্তিশালী করেছেন।সাম্রাজ্যের বিরোধী শক্তিগুলোকে একে একে দমন করেছিলেন তিনি।
তার দেখানো পথ ধরেই ইতিহাসে প্রথমবারের মত পূর্ব-পশ্চিম তুর্কি সাম্রাজ্যের উত্থান হয়েছিল।এশিয়ার পূর্বপ্রান্তে উত্থিত হয়ে সেলজুকরা ছড়িয়ে পড়েছিল পশ্চিম এশিয়ায়ও।রুম সেলজুক সালতানাতের প্রতিষ্ঠা তো তারই বিশ্বাস আর আদর্শের অনুকরণে।
সুলতান তুগরিলের আজন্ম স্বপ্ন ছিল,যেন সেলজুকরা চিরদিন একতাবদ্ধ থেকে ইসলামি বিশ্বের সেবায় নিয়োজিত থাকে।
সুলতান তুগরিলের চরিত্র ও গুণাবলিঃ
সুলতান তুগরিল বে ছিলেন দুঃসাহসী, ধীমান, বাহাদুর, দ্বিনদান, পূণ্যাত্মা ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি।শাসনকার্যের বেলায় সেই গুণাবলি আরো প্রকটভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।
তিনি ছিলেন হানাফি মাযহাবের অনুসারী।পুরো ইরান, ইরাক ও হিন্দুস্তান যখন শিয়াবাদের অন্ধকারে কাঁপছিল,সুলতান তখন নিজের মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শিয়াদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন।শীর্ষস্থানীয় আলেমদের দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি শিয়াদের বিশ্বাস ও মাযহাবের বিরুদ্ধে বইপুস্তক রচনা করিয়েছিলেন।শিয়াদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধের ময়দানে যেমন পড়েছিলেন,ঠিক একইসাথে লড়াই করেছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও।
বাগদাদ থেকে বুওয়াহিদদের দূর করার পর মিসরের ফাতিমিদের সামনেও বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সুলতান তুগরিল।ইসলামি মূল্যবোধ ও আইন রক্ষার্থে সুলতান তুগরিলের ভূমিকা অনস্বীকার্য।যা তাকে চিরঅমর করে রাখবে।
তিনি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন।এই নববি আমলকে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
১০৬৩ সাল,সুলতান তুগরিলের বয়স তখন সত্তুরে গিয়ে পড়েছে।দীর্ঘ এক কর্মময় জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে পড়েছিলেন সুলতান।তাই ৪৫৫ হিজরির রবি-আউয়াল মাসে সুলতান তুগরিল বাগদাদ ছেড়ে চিরপরিচিত রাজধানী রায় শহরে চলে আসলেন।সাথে ছিলেন ভাতিজি,চাগরি বের কন্যা আরসালান খাতুন।
অসুস্থ সৃলতান বেশ কয়েকমাস বিছানায় শায়িত রইলেন।অবশেষে ৪৫৫ হিজরির ৮ রমজান,১০৬৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ অক্টোবর জুমুআর দিনে এই মহান সুলতান,সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান তুগরিল শেষ নিঃশাস ত্যাগ করলেন।রাজধানী রায় শহরেই তাকে দাফন করা হল।
আল্লাহ এ মহান সুলতানকে যোগ্য মর্যাদা দান করুন।
১ঃ—আল কামিল ফিত তারিখ/ অষ্টম খন্ড
২ঃতারিখুজ সালাজিকা/ ড.মুহাম্মাদ আলি সাল্লাবি
৩ঃতারিখু সালাজিকাতুর রুম/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৪ঃইরান ওয়া ইরাক ফি আহদিস সেলজু'ক/ডক্টর আব্দুন্নাইম মুহাম্মাদ হুসাইন
৫ঃতারিখুস সালাজিকাহ্ ফি ইরান ওয়া ইরাক ওয়া খুরাসান/মুহাম্মাদ সুহাইল তাক্কুশ
৬ঃThe Great Seljuk Empire / A.C.S Peacock