August 20, 2021

শয়তানের ডায়েরী

শয়তানের ডায়েরী (১ম খন্ড)

(পির আলীঃ একজন আলেম, একদিন বিকেলে তিনি রাস্তায় শয়তানকে দেখে তার সাথে কথা বলছেন।)

পির আলীঃ কে যায়?
শয়তানঃ আচ্ছালামু আলাইকুম, হুজুর আমি।

পির-আলীঃ কোথায় যাও?
শয়তানঃ কোথাও যাইনা একটু রাস্তায় বেরিয়েছি।

পির-আলীঃ তোর হাতে ওটা কী?কিতাব নাকি?
শয়তানঃ না হুজুর ওটা আমার ডায়রী।

পির-আলিঃ তোর ডায়রীটা একটু দেখি ।
শয়তানঃ হুজুর ডায়রী দেখে সব জায়গা বুঝবেন না। কারণ এর অনেক জায়গায় কিছু লেখা হয়নি, শুধু সংকেত দেওয়া আছে।
তাই আমি নিজে মৌখিকভাবে আপনাকে আমার ডাইরীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মোটামুটি একটা বিবরণ শুনাচ্ছি।

হুজুর যখন শুন্তে চাইলেন তখন একটু পূর্বের ঘটনা ধরে আরম্ভ করি! কি বলেন?

পির-আলীঃ আচ্ছা তাহলে খারাপ হয়না। তবে এর সাথে তোর প্রথম জীবনেরও কিছু ঘটনা বল শুনি।
শয়তানঃ আজ বিশেষ কাজ নাই একটু অবসর আছি।

পির- আলীঃ কেন? কাজ অচল হয়ে পড়েছে নাকি?
শয়তানঃ কি বলেন হুজুর! আমার কাজ অচল! ভুল বলেছেন, কাজ আল্লাহ্র রহমতে ভালই চলছে। আমার শিষ্যকর্মী হিসেবে আল্লাহতায়লা যাদেরকে দিয়েছেন তারা আমার চেয়ে কম নয়। যদি কোন শিষ্যকে এক কাজে পাঠাই তবে সমাধা করে তিন কাজ। এই ভাবে আমার রাজ্যপনাদের দোয়ায় ভালই চলছে।

যাক হুজুর এখন শুনুন আমার কাহিনী। আমার বাল্য কালের ঘটনাদি আপনার অজানা নাই। কাজেই এখন আবার সে কথা বলে অযথা সময় নষ্ট করার লাভ নাই। পরে আমার কর্ম জীবনের ইতিহাস সম্ভবত কুরআনে বিস্তারিত পেয়েছেন। তাই সে বিষয়েও নতুন করে বলা নিষ্প্রয়োজন। তবে বর্তমান কাজের মোটামুটি বিবরণগুলো আপনাকে শুনাই।

পির- আলীঃ আরে তোর কর্মজীবনের ইতিহাস কুরআনে পেয়েছি তো কি হয়েছে এখন তোর মুখ থেকে শুনি।
শয়তান: আচ্ছা হুজুর । তাহলে বর্তমান কাজের বিবরণ একটু পরে বলছি, এখন আমার বাল্য জীবনের ঘটনা শুনুন।

আমার বাল্য জীবনের ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক, মাতৃপিতৃহীন অবস্থায় শৈশব কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করি। বুদ্ধিজ্ঞান তেমন ছিলনা বলে দিনরাত আল্লাহ্র এবাদতে মশগুল থাকতাম। এবাদত খারাপ লাগত না তাই সব সময় নফল নামাজ, নফল রোজা ইত্যাদি করতাম। অনেক যুগ এরকম এবাদত করার কয়েক শতাব্দি পর একদিন আল্লাহ্ ‌তায়ালা মাটির আদমকে সম্মান দেখাতে বলায় আমার ঘৃণা হল, কারণ আমি আগুনের তৈরি এবং আল্লাহর একজন শ্রেষ্ঠ আবেদ। দুনিয়ার এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমার সিজদা পড়েনি। তাই মাটির তৈরি আদমকে সম্মান করা আমার শোভা পায় না বলে অস্বীকার করলাম, অমনি আল্লাহ আমার এবাদতের প্রতি না তাকিয়ে আমাকে নাফরমান বলে তাড়িয়ে দিল। মনে খুব আক্ষেপ হল যে, এতো বন্দেগী করেও আল্লাহর একটি আদেশ অমান্য করার দায়ে সুখময় জান্নাত হতে চির বিদায় নিতে হল আমার।

ভেবে দেখলাম একমাত্র মাটির আদমের জন্যই আমার বেহেস্ত হারাম হলো, তাই সে বেহেস্তে আদমকে একা সুখ ভোগ করতে দেয়া হবে না। তাই সেদিন হতে আদমের পেছনে লেগে গেলাম। শুধু আদম নয় তার যত সন্তান সন্তুতি আছে সকলের সাথে আমার চিরশত্রুতা ,হুজুর আপনার সঙ্গেও আমার বন্ধুত্ব নেই।

পির- আলীঃ আরে তোর বন্ধুত্ব কামনা করিনা যা বলছিস তাই বল।

হুজুর, বেহেস্ত হতে বিতাড়িত হলাম পরে কিযে করি বুদ্ধি নেয়ার মত একটা লোকও পেলাম না। একাই ভাবনা চিন্তা করে সব কিছু ঠিক করলাম।

প্রথম চিন্তা করলাম, আদম জাতির জীবনে ক্ষতি সাধন করতে হলে তাদের শরীরে, মনে, রক্তে ও অন্তকরণে হানা দিতে হবে। তাই এ সমস্ত স্থানে অবাধ চলাফেরার জন্য আল্লাহর আদেশ চাইলাম। আল্লাহ্ পাক দয়া করে আদেশ মন্জুর দিয়ে বললেন, “আর কি চাও, দুনিয়ায় তোমার এ চাওয়া দ্বারা তোমার এবাদতের প্রতিদান বুঝে নাও।“

মনে করলাম আদম সন্তান কেয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবে, আমারও কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত দরকার। তাই আল্লাহর কাছে কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত চাইলে তাও মঞ্জুর হলো।

পরে আর কি করার দরকার ভেবে দিন কাটাতে লাগলাম হঠাৎ একদিন মনে হল আমি অভিশপ্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। আর আদম ও হাওয়া বেহেস্তে শান্তি ভোগ করছে! তাই বহুদিন চেষ্টা করে আদম ও হাওয়াকে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ালাম দেখলাম কাজ বেশ ভালোই হয়েছে।

আদম হাওয়াও আমার মত বেহেস্ত থেকে বহিস্কার হয়েছে। আনন্দে আত্নহারা হয়ে পূর্বের অভ্যাস মতো শোকরানা নামাজের নিয়ত করলাম। যাক বিনা অযুতে কোন রকম নামাজ আদায় করলাম।

এদিকে ঘটনা আরো একটি ঘটল। আদম বেহেস্ত হতে বহিস্কার হয়ে মাটিতে সেজদায় পড়ে কাঁদা শুরু করে দিলেন। নতুন বুদ্ধি খাটাতে পারলাম না এর মধ্যেই আল্লাহ তায়ালা তাকে মাপ করে দিলেন তবে অসুবিধা হলোনা, কারণ ভাবলাম আদম দুনিয়ায় এবাদত করে তা দ্বারা আবার বেহেস্ত পাবে। আর আমিও আদমের পেছনে আছি, আল্লাহ্ ভরষা।
এরপর দুনিয়ার আবহাওয়ায় ক্রমশ আমার বুদ্ধি ও বিবেক বাড়লো, কাজ কর্মেও চাপ খুব বেশি বেড়ে গেল।

পির-আলীঃ বুদ্ধির দ্বারা কি করেছ?
শয়তান: হুজুর! কি বলেন! আমার কাজ কর্মে শক্তির চেয়ে বুদ্ধির বেশি প্রয়োজন। বুদ্ধি থাকলে যে কোন শক্তি মতানুযায়ী পরিচালনা করা যায়। হুজুর দোয়া করুন এই বয়সে বুদ্ধিটুকু যেন তাজা থাকে, তাহলেই যথেষ্ট।

পির-আলীঃ মাত্র বাল্য জীবনের ঘটনা শুনলাম পরে কর্ম জীবনের খবর কী?
শয়তান: হুজুর! বাল্য জীবনের কিছুই শোনেননি। ক্ষুদ্র একটি ঘটনা বলেছি মাত্র। আমার বাল্য জীবনের ইতিহাস লেখতে গেলে বিশ, ত্রিশ বা একশ বছরে তার একাংশ ও লেখা যাবেনা। তাই বাল্য জীবন বাদ দিয়ে কর্মজীবনের দু একটি ঘটনা বলি।

বাজে ঘটনা ও বাজে কাজের হিসাব দিতে আমি অক্ষম। তবে বড় বড় নবীগণের সাথে যে সমস্ত ঘটনা ঘটিয়েছি তার থেকে কয়েকটি সংক্ষেপে বলি শুনুন।

হুজুর মাঝখানে একটি কথা বলি বেয়াদবী মাপ করবেন। আপনি নাকি বিবাহ করেননি? আমার কাছে একটি ঘটকালির প্রস্তাব আছে। মেহেরবানী করে যদি কবূল করতেন।

পির-আলীঃ আরে বাজে কথা রাখ, তোর আসল কথা বল।
শয়তান: হুজুর ! বাজে কথা নয় হাদীসে আছে, ‘নেকাহ নেছফে ঈমান’ ভাবতে পারেন হাদিস কোথায় পেলাম? আমি যখন বেহেস্তে ছিলাম তখন হাদিস, কোরান, ফেকাহ, মানতেক সবকিছু মুখস্থ করেছি।

বিদ্যার দিক দিয়ে দুনিয়ার কোন বিদ্যা আমার অজানা নেই। এজন্যই ফেরেস্থাদের মধ্যে “মোয়াল্লেমুল মালয়েক” উপাদি পেয়েছিলাম, যার অর্থ ফেরেস্তাদের শিক্ষক। এই উচ্চ বিদ্যার বলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে জয়ী হই।

ইমাম রাজী, মানুষের মধ্যে মস্তবড় যুক্তিবিদ। তার মৃত্যুর সময় আল্লাহ অস্তিত্বের পক্ষে ৩৬০ টি প্রমাণ দিলেন। আমিও এক এক করে ৩৬০ টি প্রমাণ খন্ডন করে দেখালাম যে আল্লাহ বলতে কিছুই নেই। যদি থাকে তবে একাধিক। বেচারা শেষ পর্যন্ত আমাকে বলেই ফেলল “দূর হও শয়তান” বিনা প্রমাণে আল্লাহ এক। কাজেই তার সাথে আর যুক্তি চলে না।

এভাবে প্রায়ই মানুষের সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। তাই কথার মারপেঁচে যুক্তি প্রমাণই আমার বড় সম্বল। যাক অযথা কথা বাড়িয়ে আপনার সময় নষ্ট করব না। কারণ আপনার নামাজের সময় হয়ে এসেছে।

পির-আলীঃ আমার নামাজের কথা এত সদয় হয়ে মনে করাচ্ছ কেন?
শয়তানঃ হুজুর সে আবার এক কথা, আপনারা কতক লোক আছেন, যাদেরকে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেয়া, সেহরী ও তাহাজ্জুদের ওয়াক্তে ঘুম হতে জেগে তোলা আমার একটি কর্তব্য। কারণ এর মধ্যে কিছু ক্ষতির আশা করতে পারি। না হলে অন্য কোন উপায়ে তেমন সুবিধা নেই।

ইতিপূর্বে একটা গোলে টাক পেয়ে শিখেছি। হুজুর আপনারা রাসূলুল্লা (সাঃ) এর উম্মত বলে আপনাদের মর্যাদা নাকি পূর্বাকার একজন নবীর সমান। আর দ্বিতীয়তঃ আপনি ব্যক্তিগত হিসাবে একজন নেককার। তাই ভাবছি আপনাকে নামাজ থেকে গাফেল রাখলে আবার হযরত ইয়াহিয়া (আঃ)-এর মত কান্ড ঘটতে পারে।

একদা শীতকালে রাতশেষে অতি কষ্টে হযরত ইয়াহিয়ে (আঃ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে নানা ভাবে রং বেরংয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তার চোখের উপর গাঢ ঘুমের জাল বিছিয়ে মায়াময়ী স্বপ্নে বিভোর করে রাখলাম।


এদিকে ফজরের জামাত শেষ হয়ে যাওয়ায় মনে করলাম আজকে জামাতের ছওয়াব হতে বঞ্চিত করেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, হযরত ইয়াহিয়ে (আঃ)ঘুম হতে জেগে দেখলেন জামাত শেষ হয়ে গেছে। অমনি তিনি অজ্ঞান পাগলের মত অস্থির হয়ে ভীষণ ভাবে কাঁদতে লাগলেন এবং একই সেজদায় কয়েকদিন কাটালেন। পরে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সুসংবাদ আসল “যাও ইয়াহিয়ে তোমাকে আল্লাহ তায়ালা এক জামাতের বদলে চল্লিশ জামাতের সওয়াব দান করলেন।”

এটা শুনে অন্তরে খুব দূঃখ পেলাম। কারণ মানুষ এই রকম সওয়াব পেতে থাকলে আমি একা কতদূর কি পারব। তাই হুজুর আপনার বেলায়ও সেই কথা মনে পড়ছে। হুজুর সকল কথা বলতে সাহস পাই না।

পির-আলীঃ ভয় কী? আমি এসব কথা লোক সমাজে প্রকাশ করব না।
শয়তান: না হুজুর সে ভয় না, কথা হলো এই যে, আমার চক্রান্ত ও অভিসন্ধির কথা আপনাকে জানালে আপনি হয়ত পূর্ণ সাবধানতা অবলম্বন করবেন, আপনার বাড়ির উপর দিয়ে আমার আর পথ থাকবেনা। তাই ভাবছি কি করি?

পির-আলীঃ আরে! নতুন করে আমার কোন সাবধানতা অবলম্বন করতে হবেনা। যতটুকু সাবধান আছি এটাই আল্লাহর রহমতে যথেষ্ট।
শয়তান: হুজুর মাপ করবেন যতটুকু সাবধানে আছেন তাও হিসাবে গনিনা।
জগতের সেরা নবী হযরত মুহাম্মদ (স) কেই অনেক সময় বিভ্রাটে ফেলে দিতে সক্ষম হয়েছি।
একদিন হযরত মুহাম্মদ (স) এক সভায় কোরআন পাঠ করে শুনাচ্ছিলেন। অনেক আয়াত পাঠ করার পর আরব্য মূর্তির কথা আলোচিত এক আয়াত পাঠ করার সময় আমি গিয়ে তাঁর কণ্ঠের সাথে মিলি এবং যেখানে “আরব্য মূর্তির পূজা অর্চনা করি না” বলে নির্দেশ আছে সেখানে আমি “মূর্তির পূজা কর” কথাটুকু সংযোগ করে দিই।

সাথে সাথে সমস্ত আরবে কথাটা ছড়িয়ে পড়ল, বহু বিধর্মী খুশি হল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত রাসূল (স) আমার ষড়ষন্ত্র ফাঁস করে দিলেন।
যা হোক তবুও যা করেছি তা কম নয়।

হুজুর! আপনাকেও ছাড়িনি সত্য করে বলুন হুজুর গতদিন মাগরিবের নামাজের সময় ইমামের পিছনে একতেদা করে মনে মনে বাজার খরচের হিসাব মিলাননি? মনে পড়ে? আমিই তিনবার আপনাকে হিসাব অমিল করে দিলাম এবং নামাজের আখেরী বৈঠকে আপনার হিসাব মিলিয়ে দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাই।

কোন বড় কাজে যাইনি একজন অলি-আল্লাকে একটু পরীক্ষা করে এলাম। সে কথায় একটু পরে আসছি। আপনার কাছে বলতে ভয় কি? তবে ইয়াহ্ইয়া (আ) এর মত নিজ কাজে একটু সাবধানতা অবলম্বন করবেন এই যা?

ইয়াহ্ইয়া (আ) একদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এমন সময় আমি সেখান দিয়ে যাচ্ছিলাম দেখে তিনি আমাকে ডাক দিলেন। যাওয়ার পর বললেন কেমন আছ? বললাম ভালো আছি।

আবার জিজ্ঞেস করলেন তোর হাতে কি? বললাম রশি। তিনি বললেন তা কি কাজে আসবে। বললাম হুজুর বড় বড় আবেদ ও নেকবার বান্দাদের কে মাঝে মাঝে বাঁধতে হয়। তিনি বললেন তা কিভাবে? আমি বললাম হুজুর! একদিন আপনাকেও বেঁধেছি। তিনি আশ্চর্য্যান্বিত হয়ে বললেন তা কবে? বললাম হুজুর যেদিন রাত্রে উটের গোস্ত দিয়ে পেট পুরে খেয়ে শুয়েছেন। সেদিন আপনাকে বেঁধেছিলাম বলে ফজরের নামাজ কাজা করেছেন।

তিনি বললেন 'আস্তাগ ফিরুল্লাহ’ জীবনে আর কোন দিন পেট ভরে খানা খাবনা। আমি বললাম আস্তাগ ফিরুল্লাহ আমিও জীবনে কারো কাছে উচিত কথা আর বলব না।

পির-আলীঃ তবে আমার কাছে ও কি সত্য কথা গোপন কর?
শয়তান: নাউজুবিল্লাহ্, আপনার কাছে এক অক্ষর ও মিথ্যা বলিনা।

পির-আলীঃ তোকে বিশ্বাস করা যায়না। কারণ গতদিন মাগরিবের নামাজে নাকি আমাকে দাগা দিয়েছিল।

শয়তান: হুজুর আমাকে বিশ্বাস করেননা কেন? হাদিসে পাননি যে, নামাযের কাতারের মধ্যে যদি ফাঁকা জায়গা থাকে তবে আমি গিয়ে অধিকাংশ সময় সেখানে দাঁড়াই। যদি গতদিন আপনার পাশের লোক কাতারে ফাঁকা জায়গা না রাখত তবে কি আমি আপনাকে দাগা দিতে পারতাম? আমার দোষ কি? জেনে শুনে আপনারাই যে আমাকে স্থান দেন। না হলে আমার কি সাধ্য আছে।

পির-আলীঃ কাতারের মধ্যে ফাঁকা স্থানে দাঁড়িয়ে জামাতে নামাজও আদায় করোনাকি?
শয়তান: হুজুর, শুধু জামাতে নামাজ নয়, আমার কাজ আদায় করতে হলে অনেক সময় নফল নামাজ রোজাও আদায় করতে হয়, তবে শুনুনঃ

একদিন সন্ধ্যাবেলা এক বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলাম, কতদূর গিয়ে দেখলাম একটি ছোট মসজিদে একজন দরবেশ নামাজ আদায় করছে, মনে হল একটু পরীক্ষা করি।

তাই বড় এক অলি-আল্লার ছুরতে লম্বা জামা ও বড় পাগড়িসহ মসজিদে ঢুকে নামাজ আরম্ভ করতে লাগলাম।

ইতোমধ্যে আমার একজন শিষ্য লম্বা জামা ও বড় দেস্তার বেঁধে নানা রকম সুস্বাদু খাদ্য পূর্ণ একটি বড় ডিস নিয়ে আমার পেছনে দাঁড়িয়েছিল। আমি বিশ পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই দুই রাকাত নামাজ আদায় করে পেছনে ফিরে বললাম, কি বাবা কেন এসেছ?

অমনি সে দেস্তার বাঁধা ফেরেস্তারূপী শিষ্য আমার পা জড়িয়ে খুব কান্নাকাটি আরম্ভ করল। আমি বললাম কি হয়েছে? সে বলল হুজুর আমাকে মাফ করুন, আমি মস্তবড় বেয়াদবি করেছি। আপনি মাফ না করলে আল্লাহ তায়ালা ও আমাকে মাফ করবেননা। হুজুর আপনি জানেন-যে, আজ চল্লিশ বছর যাবৎ আল্লাহর আদেশে আমি প্রতিদিন ইফতারের আগে বেহেস্তের নাস্তা
নিয়ে আপনার দরবারে হাজির হই। আজ ও আমি নাস্তা নিয়ে আপনার সেই পূর্বের মসজিদে বসেছিলাম।

যখন দেখলাম ইফতারের সময় হয়ে এলো, তখন আমি অত্যন্ত ভীত হয়ে এই নাস্তা নিয়ে আপনাকে চতুর্দিকে খোঁজ করি। বহু খোঁজার পর এখানে এসে আপনাকে পেয়েছি।

আমি বললাম বাবা তোমার কোন দোষ নাই। গতরাতে তাহাজ্জুদের ওয়াক্তে জিব্রাইল (আঃ) আমাকে বলল, হুজুর আমি একটা জরূরী সংবাদ নিয়ে এসেছি। আগামী রাতে আল্লাহ তায়ালা আপনার সাথে দেখা দিবেন, অতএব আপনি কোন নির্জন স্থানে চলে যান। কারণ আল্লাহতায়ালা দুনিয়ায় প্রকাশ্যভাবে কারো সাথে দেখা দেন না। তাই হযরত মুসা (আঃ) নির্জন তুর পাহারে আল্লাহর দীদার লাভ করেছেন। সেরা নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নির্জন হেরা পাহারের গুহায় আল্লাহর দীদার লাভ করেছেন। অতএব আপনাকেও আল্লাহতায়ালা নির্জন কোন স্থানে যেতে আদেশ করেছেন।

এই সংবাদ পেয়ে আল্লাহ তায়ালার আদেশে এখানে এসেছি। তুমি যাও তোমার কোন অপরাধ নাই। শিষ্যটি চলে যাবার পর ঐ দরবেশের প্রতি একপলক চেয়ে দেখলাম সে আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। আমি নাস্তার ডিসটি টেনে নিয়ে দরবেশটির দিকে চেয়ে বললাম, আসুন ভাই সাহেব’ আমার সাথে একটু নাস্তা করুন। কারণ হযরত আলীর মত আমারও একটি অভ্যাস আছে, মেহমান ছাড়া খানা খাই না। তবে আজ কোন মেহমান পাব বলে মনে করিনি। আল্লাহ পাক আপনাকে মিলিয়েছেন।

পরে দেখলাম কাজে অনেকটা সফল। দরবেশটি আমার কথা মত খানা গ্রহণ করলে অমনি তার অন্তর চক্ষে একটা আবরণ পড়ে গেল এবং সে আমার সঙ্গ প্রিয় হয়ে উঠল।
অতঃপর আমার পরিচয় জানতে চাওয়ার এদিক সেদিক নানা কথার পরে বললাম আমি নির্জন স্থান খোঁজ করছিলাম বলে এখানে এসেছি। আপনি থাকলে আমার একটু অসুবিধা তাই আমি অন্যত্র যাচ্ছি।

এটা শুনেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “হুজুর! আমি আপনাকে ছাড়ব না। দয়াপূর্বক আমাকে ও একটু সৌভাগ্যশালী করুন।

বহু ধরপাকড়ের পর আমি বললাম, আপনি আল্লাহর নূরের তাজাল্লী সহ্য করতে পারিবেন তো? সাবধান হযরত মুছা (আঃ) কিন্তু বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন।

সে বলল, হুজুর! আপনি যেভাবে বলবেন, সেভাবে কাজ করব। ইতোমধ্যে আমার পূর্বইঙ্গিত অনুযায়ী একজন শিষ্য আলোর ঝলকে সজ্জিত হয়ে মহা প্রতাপ ও আড়ম্বরের সাথে পশ্চিম দিক দিয়ে আকাশ পথে আমাদের কাছে এসে হাজির হল। তখন আমি দরবেশকে লক্ষ্য করে বললাম ঐ যে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার নুর দেখা যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি সেজদা করুন।

দরবেশটি আগপর না ভেবে বিনা দ্বিধায় আমার কথা অনুযায়ী যখন সেজদা করলো, আমি তখন সজোরে একটা হাসি দিয়ে বললাম “কিল্লা ফতেহ” মনের আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে দরবেশটিকে একটি লাথি দিয়ে ফুটবলের ন্যায় মসজিদের বাইরে ফেলে দিলাম। আর বললাম- আরে মুর্খ। কোরান-কিতাব না জেনে দরবেশ হয়েছিস? ভাল করেছিস। ত্রিশ বছর যাবৎ এবাদৎ করে শেষে শয়তানের একজন খাঁটি বান্দা হিসেবে নাম লিখিয়েছ। চিন্তা করওনা বেহেস্ত না পাইলেও দোজখ অবশ্যই পাইবা, সন্দেহ নাই।

অতঃপর ওখানে কাজ এইরুপ সমাধা করে অন্যত্র রওয়ানা করলাম।

পির-আলীঃ কোরান কিতাবে যারা অজ্ঞ তাদেরকে হয়তো সহজে বিভ্রান্ত করতে পার। কিন্তু যারা কোরান কিতাবে পাকা আলেম তাদেরকে সহজে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারো?

শয়তান: হুজুর! কোনো কিতাব পড়া পাকা আলেম তো দূরের কথা তাদের জবর আলেমও হিসাবে গনি না। তবে বাস্তবিক যারা কোরান কিতাব শিক্ষা করে আধ্যাত্নিক বিদ্যায় পূর্ণতা অর্জন করে তাদেরকে আজ পর্যন্ত সহজে তেমন কোন ধোকায় ফেলিতে পারি নাই। তবে চেষ্টা ছাড়ি নাই।

একবার মনে হল পীর-কুল খারাপ, তাহলে বিনা চেষ্টায় বহু কাজ সফল হবে। এই ভেবে একদিন তাহাজ্জুদ নামাজের ওয়াক্তে সোনালী রঙ্গের একখানা তস্তুরী ভরিয়া কিছু নাস্তা নিলাম এবং নিজে আলোর ঝলকে সজ্জিত হয়ে সূর্য্যসম দীপ্ত চেহারায় ভূষিত হলাম। অতঃপর তস্তুরীখানা হাতে নিয়া হযরত আব্দুল কাদির জিলানীর বাড়ির দিকে রওনা করলাম। সেখানে পৌঁছিয়া দেখলাম তিনি আল্লার জিকিরে মশগুল আছেন। তখন আমি দ্রুতগতিতে তার সামনে গিয়ে হাজির হলাম। তখন আমি ভারি গলায় বললাম “হে আব্দুল কাদির! তোমার এবাদতে আমি এত সন্তুষ্ট হয়েছি যে, আজ পর্যন্ত দুনিয়ার কোন বান্দার উপর এত অধিক সন্তুষ্ট কখনও হতে পারি নাই। তাই জিব্রাইলকে না পাঠিয়ে আমিই তোমাকে দেখা দিতে এসেছি। লও আমার তবারক, গ্রহন কর।

এই কথা শুনে পীর আব্দুল কাদির জিলানী প্রথমত একটু চিন্তিত হয়ে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে কি যেন ভাবলেন দেখলাম এবং পরমুহূর্তে মাথা উত্তোলন করে সজোরে বললেন “লা হাওলা কু্যাতা ইল্লা বিল্লাহ” দূর হ শয়তান।

লা হাওলা শব্দ শুনে আমি অসহ্য হয়ে সেখান হতে দ্রুত পলায়ন করলাম। তাই এই ধরনের কতক লোক নিয়ে একটু চিন্তিত আছি। কি করা যায়।

পির- আলীঃ ইতোপূবে বড়াই করে বলেছ যে, সকল রকম বিদ্যা আমার জানা আছে । কিন্তু মা’রেফৎ দিয়ে বিশেষ দক্ষতা আছে বলে মনে হয়না।

শয়তান: হুজুর! সে একটা দুঃখের কাহিনী। আমি যখন জান্নাতে ছিলাম, তখন মা’রেফৎ বিদ্যায় মোটামোটি পারদর্শি ছিলাম। জান্নাতে অনেক ফেরেস্তাকে আমিই মা’রেফৎ শিক্ষা দিতাম। আমার কাছে শিক্ষা গ্রহন করে বহু ফেরেস্তা মা’রেফৎ বিদ্যায় পূর্ণতা অর্জন করেছেন। আমিও সকল রিপু দমন করেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ আত্মগরিমা খর্ব করতে পারি নাই, তাই পূর্ণতা অর্জন করতে অসমর্থ হয়েছি।

দ্বিতীয়তঃ যতটুকু মা’রেফৎ আমার জানা ছিল উহাও চর্চ্চার অভাবে ক্রমশঃ নিস্তেজ হয়ে এসেছে। তবে যা জানি তাতে আজকালকার মা’রেফৎবিদগণকে পথভ্রষ্ট করতে তেমন বেগ পাইতে হয়না।

হুজুর! উচিৎ কথা কি জানেন? আল্লাহ্ তায়ালার শিক্ষা দেয়া সেই মা’রেফৎ আজ আমার মধ্যে বাস্তবিকই নাই। এখন যা আছে উহা মানুষকে বিভ্রান্ত করার অস্ত্র মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে উহা দ্বারা কাজ হাছিল করতে হয়।

একদিন এক ব্রাহ্মণকে বললাম, ‘আরে ব্রাহ্মণ’’! শুধু ব্রাহ্মণী করো ইহাতে লাভ কি? আস, তোকে একটা নতুন বিদ্যা শিক্ষা দিয়ে দেই।

সে রাজী হলে পরে এই ভ্রান্ত বিদ্যার একটা সাধারণ ছবক তাকে দিয়ে দিলাম। কয়েক দিন ধরে একই ছবক চর্চ্চা করার পরে সে একটা নতুন জিনিষ লাভ করল, সেটা এই যে- ব্রাহ্মণ তার নিজ ইচ্ছানুযায়ী শূন্যে উড়ে চলতে পারত। তাকে প্রায়ই শূন্যে ভ্রমণ করতে দেখে দেশের সকল লোক তার নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করার জন্য দলে দলে আসতে আরম্ভ করল। বেশ এইভাবে ব্রাহ্মণ আমার কাজ যথেষ্ট অগ্রসর করে দিলো।

বহুদিন পর একদা ব্রাহ্মণ আকাশ পথে উড়ে যাচ্ছিল, এমন সময় একজন, এক কামেল পীর সাহেবকে তা জানান। তার পীর সাহেবও দেখলেন বাস্তবিক একটি বে-দ্বীন ব্রাহ্মণ আকাশ পথে উড়ে যাচ্ছে।

তখন পীর সাহেবের পায়ের একখানা খড়মখানা মুহূর্তের মধ্যে শূন্যে উঠে গিয়ে ব্রাহ্মণের পৃষ্ঠে আঘাত করতে করতে মাটিতে নামিয়ে আনল।

পীর সাহেবঃ জ্যোতিস্মান অন্তর চক্ষু দ্বারা তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “তওবা কর্ নয়তোবা মোছলমান হোজা।”

ব্রাহ্মণ পীর সাহেবের অন্তর- জ্যোতির ফলে অত্যন্ত ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে তওবা করে মোছলমান হয়ে গেল এবং সেখান থেকে প্রকৃত মা’মারেফতে পূর্ণতা অর্জন করল।
তাই দ্বিতীয়বার আর তাকে ফাঁদে ফেলাতে সুয়োগ পাই নাই।

হুজুর! কি বলব? এইরূপভাবে মাঝে মাঝে অনেক পীর আমার কতক খাছ লোক ভাগাইয়া নিয়ে যায়। ইহা কি তাদের উচিৎ ।
হুজুর! আপনিই বিচার করুন।

পির- আলীঃ বিচার শুধু পীরের করব কেন? তুইও যে তাদের মুরীদ ও ভক্তদেরকে বিভান্ত করিস তোরও বিচার করা উচিত।

শয়তানঃ হুজুর! এ কি বললেন?
আপনি আলেম মানুষ হয়ে একটা আল্লাহ বিরোধী কথা বলে ফেললেন। ইহা কি আপনার পক্ষে সমীচীন হয়েছে?

আল্লাহতায়ালা কোরান পাকে বলেছেন, আমি কখনও কোনো সম্প্রদায়কে বিপথগামী করিনা, যে পর্যন্ত তারা নিজেরা বিপথগামী না হয়।


হুজুর! একথা দ্বারা পরিস্কার, প্রমাণীত হয় যে, যদি কোন মানুষ নিজের জন্য অসৎ, অন্যায় ও দূর্নীতিকে পছন্দ করে সে ব্যক্তিকে অসৎ ও দূর্নীতিপরায়ণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাকে আমার হাতে ন্যস্ত করেন।

ইহা ছাড়া আমি কাহাকেও গোমরাহ্ করতে পারি না। তাই যদি পারতাম তাহলে দুনিয়ার সকল মানুষকে এক মিনিটের মধ্যে নাফরমান করে দোজখী খাতায় নাম লিখিয়ে দিতাম। কিন্তু তা পারিতেছিনা।

তবে আজকালের কথা কি আর বলিবেন?
হুজুর! আজকাল মানুষকে গোমরাহ্ করতে তেমন চেষ্টা বা দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন হয় না। তারা নিজেরা এসেই আমার হাতে বায়াত হয়ে এক একজন গোমরাহীনতার ছনদ নিয়ে যায়।

কিন্তু এ যে বলেছি,কোরান, কিতাব শিক্ষা করে যারা মা’রেফৎ বিদ্যায় পূর্ণতা অর্জন করেছে, তাদের কাছে একটু নত আছি, সেই ধরণের লোক এখনও অনেক আছে। তাই তাদের কাছে গিয়ে বিশেষ সুবিধা করে উঠিতে পারি না।

আবার একটা মুস্কিল হল যে, এই ধরনের বূজর্গ বা আলেমরা বহু অশিক্ষিত মানুষকে নিজ ছোহবতে রেখে মা’রাখিয়া মা’রেফৎ বিদ্যায় কামেল করে দিচ্ছে। এদেরকে গোমরাহ্ করা মুস্কিল, কারণ এরা পীরের কথায় জীবন দিতে রাজী শরীয়তের ব্যাপারে তো দূরের কথা। দুনিয়ার ব্যাপারেও পীরের আদেশ ও এজাজত পালন করা ওয়াজেব মনে করে এরা। এরা পীরের পরামর্শ ব্যতীত কোন কাজে অগ্রসর হয় না।

তাই এদের পীরকে গোমরাহ্ করতে পারিলে মুরিদগণ নিজে নিজেই গোমরাহ্ হয়। কিন্তু পীরকে কিছু না করতে পারলে তার মুরীদকেও কিছু করা সম্ভব হয়না।

হুজুর সুবিধা কিছুই নয়। কামেল পীরের মূর্খ মুরিদের যে পযর্ন্ত পীরের ছোহবতে থেকে মা’রেফৎ শিক্ষা করে এবং পীরের হাতে জীবন ন্যাস্ত করে তাঁর আদেশ নিষেধকে ওয়াজেব মনে করে সে পর্যন্ত আমার একটু অসুবিধা ভোগ করতে হয়। কিন্তু যখন ঐ পীরের ছোহবৎ ছেড়ে একটু বাইরের আবহাওয়ায় চলাফেরা করে তখনই আমার বড়শীতে ধরা পড়ে।

শয়তানঃ হুজুর! একদা একজন মূর্খ দরবেশ বহুদিন পর্যন্ত একজন কামেল পীরের ছোহবতে থেকে মারেফতে মোটামুটি কিছুটা জ্ঞানার্জন করে পূর্ণতা লাভের পূর্বে পীরের দরবার হতে বিদায় নিয়ে দেশে রওয়ানা করল। সারাদিন পথ চলার পরে হঠাৎ আমার সাথে দেখা। আমি তাড়াতাড়ি একজন পথিক বেশে তার কাছে এসে উপস্থিত হলাম এবং একই সাথে পথ অতিক্রম করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে দরবেশটির সাথে একটু আলাপ করার অবকাশ পেলাম বলে ধীরে ধীরে নানা রকম কথা-বার্তার মধ্যে তাকে মশগুল করলাম এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তার অপরিসীম প্রশংসা করতে করতে সেরা নবী হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর চেয়েও তার দরজা বড় বলে প্রমাণ করে দিলাম। দেখলাম দরবেশটি একটু খুশী হয়েছে। ভাবলাম অবস্থা আয়ত্বে এসেছে। ইতোমধ্যে দেখলাম একটা লোক অত্যন্ত ব্যস্তভাবে পাগলের ন্যায় আমাদের সম্মূখ দিয়ে দৌড়াইয়া যাচ্ছে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে পূনঃজিজ্ঞাস করলাম, ভাই ব্যাপারটি কি বল। অতঃপর সে উত্তর করল ভাই গতদিন আমার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সকলে একখানা নৌকায় চড়িয়া বেড়াতে যাওয়ার সময় নৌকাখানি এই নদীতে নিখোঁজ হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত এর কোন খবর পাই নাই। আমি সর্বহারা হয়েছি আমাকে দয়া করুন।
আমি হতাশ লোকটির পিঠে হাত বুলায়ে বললাম, ভয় নাই। আল্লাহর দোস্ত এখানে আছে।

পাশের দরবেশটির দিকে আঙ্গুলী ইশারা করে বললাম, এই যে এ জামানার কুতুব। ইনার পা জড়িয়ে ধরতে গিয়ে ছেজদা দিয়ে বসল এবং কান্নার স্বরে বলল, "হুজুর! আমাকে রক্ষা করুন”।

আমি এই ফুরছতে তাড়াতাড়ি নদীর তীরে গিয়ে চতুর্দিকে একবার তাকিয়ে নদীর উত্তল তরঙ্গের মধ্যে নৌকাখানির সন্ধান করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ খোঁজ করার পরে দেখলাম নৌকা খানি এখন পর্যন্ত ডুবে নাই। পথ হারিয়ে প্রবল ঝড়ের তাড়নায় বহুদূরে একটি চড়া-ভূমির উপর উঠে রয়েছে। নৌকার যাত্রীগণ সকলে ম্লান মুখে আল্লা-বিল্লাহ করছে।

আমি এই অবস্থা দেখে দ্রুত এসে দরবেশটির কানে কানে বলে দিলাম, হুজুর! নৌকাখানি এখন পর্যন্ত ডুবে নাই। অমুক চড়া-ভূমির উপর উঠে রয়েছে।

দরবেশটি এই খবর শুনে হতাশ লোকটিকে অভয় দিয়ে বলর, "যাও বাবা ভয় নাই। অমুক চড়া ভূমিতে গিয়ে দেখ তোমার নৌকা এখন পর্যন্ত ভালো আছে"।

হতাশ লোকটি দরবেশটির পায়ে আর একবার কপাল ঠেকাইয়া সেজদা করে সেই চড়া-ভূমির উপর উঠে। সেখানে দেখে তার যাত্রীগণ সুস্থাবস্থায় আছে। লোকটি সকলের কাছে দরবেশটির এই উপহারের কথা বলল এবং সকলকে নিয়ে পূনঃদরবেশটির কাছে এসে পৌঁছিল অতঃপর পুত্র পরিজন সকলে একত্রিত হয়ে দরবেশের অশেষ উপকারের কথা স্মরণ করতে গিয়ে অবনত মস্তকে তার পা ঠেকাইয়া বার বার ছেজদা, কুর্নিশ করতে আরম্ভ করল।

এরপরে এই সংবাদ চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ায় বহুলোক এসে দরবেশটিকে অজস্র টাকা, পয়সা, হাদিয়া তোহফা দেয়া আরম্ভ করল এবং সঙ্গে সঙ্গে ছেজদা, পুজাও করতে ছাড়লনা।

আমি বললাম হুজুর! আর দেশে গিয়ে লাভ নেই । এখানে আপনার আস্তানা করুন। অতঃপর একটি বট বৃক্ষের নিচে দরবেশটিকে বসাইয়া দিয়ে আমি চলে আসলাম। দরবেশটি যতদিন জীবিত ছিল ততদিন এভাবে আমার একজন খাঁটি প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করে বহু নিরীহ মানুষকে জাহান্নামের তলদেশে পাঠিয়েছে। দরবেশটিকে এভাবে ছেজদা নিতে দেখে আমারও অত্যন্ত ভয় হয়েছিল।

পির-আলীঃ আরে! তোর ভয় হয়েছিল? ইহা শুনে দেখি আমার হাসি পায়।
শয়তানঃ হুজুর! হাসির কথা বলি নাই, উচিৎ কথাই বলেছি। আজকাল মানুষের মধ্যে এমন সকল দুর্দান্ত প্রকৃতি ও চরম পাশবিকতা বিস্তার পেয়েছে যাতে বাস্তবিক পার্শ্বে বসে মাথায় হাত দিয়ে ঝিমাইতেছিলাম। এমন সময়, ঐ রাস্তা দিয়ে জাকারিয়া (আঃ) যাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে নিঝুম অবস্থায় বসা দেখে বললেন,-“কি ঝিমাইতেছ কেন? আজকাল পল্লী অঞ্চলে যাও না নাকি?

আমি বললাম হুজুর! পূর্বে অনেক যেতাম কিন্তু আজকাল যেতে সাহস পাই না। তিনি বললেন কেন? কি হয়েছে? আমি বললাম, হুজুর!পল্লীবাসী আমারই শিষ্য সাগরেদ। কয়েক বছর যাবৎ তাদের পিছনে আমার যথেষ্ট চেষ্টা সাধ্য ব্যয় করতে হয়েছে। এরপরে দেখলাম তারা আমার শিক্ষা ব্যতীত আরও নানা শিক্ষায় ভাল শিক্ষিত হয়েছে।

অন্তর অন্তর কয়েক বছরের মধ্যে ঐ পাড়ায় যাবার বিশেষ সময় পাই নাই। বহুদিন পরে একদিন ঐ পল্লীর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে চাইল পুরান পল্লীটা একটু দেখেই যাই। তাই সেদিন ঐ পল্লীতে থাকার ধারণা করে সেখানে গেলাম।

হুজুর! গিয়ে দেখি ভয়াবহ কাণ্ড কারখানা। মানুষের নামাজ রোজা দূরের কথা আল্লাহর নাম, পরিচয় সে পল্লি হতে উঠে গেছে। মদ, জুয়া, হারামী, বজ্জাতী, শয়তানী, খরাবী, তাদের প্রধান এবাদৎ। তাদের এসব দেখে ভয়ে অন্তর কেঁপে উঠল।

মূহুর্তকাল সেখানে অপেক্ষা না করে চলে আসলাম। মনে মনে ভাবলাম আমি আল্লাহ তা'লার একটি সাধারণ হুকুম পালন করিনাই বলে চির অভিশপ্ত হয়েছি। আর তাদের উপর না জানি কতবড় বজ্রাঘাত পতিত হয়। সে বজ্রাঘাতের ধাক্কা সামলাতে না পেরে যদি অসময়ে মরে যাই, তবে, হুজুর শয়তানী করবে কে?

এই ভয়ে আজ পযর্ন্ত সে পল্লিতে যেতে সাহস পাই নাই।
কি বলেন হুজুর?
সে সমস্ত স্থানে যেতে কি মন সাহস পায়?

পির-আলীঃ- তবে বুঝা গেল তোর চাইতেও বড় শয়তান মানুষের মধ্যে আছে।

শয়তানঃ হুজুর! ভাতের চাইতে ডাইল উঁচু। আমার শিষ্য সাগরেদদের আজ আমি হার মানি। কারণ তারা যে সমস্ত অভিনব ও ভয়াবহ পথ আবিস্কার করেছে তার অনেকটা আমার বুদ্ধির বাইরে, আবার অনেকটা আমার সাহসের বাইরে এবং অনেকটা আমার কৌশলের উর্ধে।

শুনতে চান হুজুর! মানুষ আল্লাহ্ তায়ালার অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আমি এত বড় সাহস কখনো পাই নাই।
মানুষ প্রকাশ্যে আল্লাহ্তায়ালার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। তা দেখে আমি খুব বেশি ভীত হইয়া পরিয়াছি এবং ভাবতেছি মহা প্রলয় অতি নিকটবতী। আমি যে সমস্ত বুদ্ধি ও কৌশল দ্বারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতাম তার চেয়ে সুন্দর ও সুক্ষ্ণ কৌশল মানুষই আজ আবিস্কার করে নিয়েছে। তাই ইহা দেখে কিছুদিন পূর্বে আল্লাহ্তায়ালার দরবারে মোনাজাত করে বলেছিলাম যে, হে আল্লাহ্! মানুষের মধ্যে এখন যে সমস্ত শয়তান পয়দা হয়েছে তাতে এখন আর দুনিয়ায় আমার বিশেষ প্রয়োজন নাই। অতএব, যে কয়দিন এখন আমার হায়াৎ আছে কোন রকম সকম বিপদ এড়াইয়া সেই কয়দিন থাকতে পারলেই হয়।
আপনিও দোয়া করবেন হুজুর!

শয়তানঃ হুজুর পাপের ভয় করি না। নাকের উপরে পানি এক আঙ্গুলী যা কথা, চৌদ্দ হওয়াও সেই কথা। তবে আমাকে দায়ী বেশি করতে পারবেন না। কারণ আল্লাহ্তায়ালাই বলে দিয়েছেন যে, হে মানুষ সাবধান থাকিও শয়তান তোমাদের প্রধান শত্রু। একথা জানিয়াও যদি কেউ আমার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে আসে তবে কি আমার দোষ?