March 14, 2022

Osmani Khelafot History

.............উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস.............
____পর্ব:১_______
প্রসঙ্গ: তুর্কিদের মূল বংশধারা এবং আবাসস্থল.

মা-ওরাউন্নাহার তথা ট্রান্স-অক্সিয়ানার যে অঞ্চল কে আমরা বর্তমানে তুর্কিস্তান নামে পরিচয় দিয়ে থাকি তা মঙ্গোলিয়ার মালভূমি থেকে শুরু করে পূর্বের উত্তর চীন,পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর এবং উত্তরে সাইবেরিয়ান উপকূল থেকে নিয়ে ভারত উপমহাদেশে এবং ইরান পর্যন্ত বিস্তৃতওগুজ উপজাতি এবং তাদের বড় বড় গোত্রগুলো এখানে বসবাস করছে এবং তুর্কি নামে পরিচয় লাভ করেছে।


খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এসে এই গোত্রগুলো তাদের মূল বাসস্থান ছেড়ে এশিয়া মাইনরে হিজরত করে যায়। ইতিহাসবিদগণ তাদের হিজরতের কারণ উল্লেখ করেছেন:
কেউ বলেন তাদের এই হিজরত ছিল অর্থনৈতিক কারণে। প্রচন্ড করা এবং বংশবৃদ্ধি এই গোত্রগুলোর আদি বাসস্থান এর ঘনবসতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তারা খাদ্য চারণভূমি এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের তালাশে সেখান থেকে হিজরত করে। কেউ কেউ তাদের এই জোটকে রাজনৈতিক কারণে সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে থাকেন। কেননা সেই গোত্রগুলো তাদের চেয়েও শক্তিশালী মঙ্গোলীয়া তোপের মুখে পড়েছিল। তারাই তাদেরকে নিরাপত্তা এবং সুস্থির জীবনের সন্ধানে স্বদেশ ত্যাগ করে অন্যত্র হিজরত করতে বাধ্য করে।

সেই হিজরতকারী গোত্রগুলো পশ্চিম-অভিমুখী হতে বাধ্য হয় এবং হাইজুন নদীর কাছাকাছি অবস্থান গ্রহণ করে। অতঃপর একসময় তারা তিবরিস্তান এবং জুরজানে এসে আবাস গড়ে তোলে।
ফলে ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ এবং ইরানে
সাসানিদ রাজ বংশের পতনের মধ্য দিয়ে মুসলিমগণ যেসব এলাকায় বিজয় করে নিয়েছিল,
তার নিকটবর্তী হয়ে যায়।

মুসলিম বিশ্বের সাথে তাদের সংযুক্তি:

৬৪৩ খিষ্টাব্দে ইসলামিক বাহিনী হালব (আল্লেপ্পো) বিজয়ের জন্য রওনা হয়। সেখানে তুর্কিরা বাস করত। সেখানে ইসলামী বাহিনীর সেনাপতি আব্দুর রহমান সঙ্গে তুর্কিদের বাদশা শাহরাবারাজের সাথে সাক্ষাত হয়। তিনি আব্দুর রহমানের কাছে সন্ধি-প্রস্তাব করেন এবং আর্মেনীয়ার সাথে যুদ্ধে ইসলামী বাহিনীর অংশীদার হওয়ার আশ্বাস দেন।


আব্দুর রহমান তাকে সেনাপতি সুরাকা ইবনে আমর এর নিকট প্রেরণ করেন। শাহরাবারাজ সুরাকার সাথে সাক্ষাত করলে তিনি তার এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ব্যাপারটি জানিয়ে পত্র লেখেন। তিনি তার এ কাজের প্রতি সম্মতি প্রকাশ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের মাঝে সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হয়। তুর্কি এবং মুসলিমদের মাঝে কোন যুদ্ধ হয়নি। বরং তারা সকলে মিলে আর্মেনিয়া বিজয়ের জন্য আক্রমণ করে, ফলে সেখানে ইসলামের প্রসার ঘটে।

মুসলিম বাহিনীর সদস্য তথা ইরান বিজয়ের পর পশ্চিম দিকের শহরগুলো জয় করে সেখানে আল্লাহর নাম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এগিয়ে যায়, যেসব অঞ্চল দখল এর ক্ষেত্রে ইরান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছিল। সন্ধির কারণে এই প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যায় এবং মুসলমানরা সেসব অঞ্চলে অধিপত্য বিস্তার করে। তাদের মাঝে তুর্কিরা ও ছিল।
এর মধ্যদিয়ে ইসলামী জাতিগুলোর সাথে তাদের সম্পৃক্ততা পরিপূর্ণ হয়।তুর্কিরা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর দ্বীনের ঝান্ডাবাহী মুজাহিদগণের কাতারে যোগ দেয়।

খলিফা উসমান বিন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে তিবরিস্তান বিজয় হয়। অতঃপর মুসলিমগণ হাইজুন নদী পাড়ি দিয়ে ৩১ হিজরিতে মা-ওরাউন্নাহার অঞ্চলে অবতরণ করে। ফলে অনেক তুর্কি ইসলাম গ্রহণ করে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর আহ্বান ছড়িয়ে দিতে জিহাদের ময়দানে মুশরিকদের মুখােমুখি হয়।

ইসলামি বাহিনী সে অঞ্চলে তাদের অভিযান অব্যাহত রাখে। খলিফা মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের শাসনামলে বুখারা জয় হয়। বিজয়ী বাহিনী সামনে যেতে যেতে সমরকন্দ পৌঁছে যায়। একটা সময় মা-ওরাউন্নাহারের অন্তর্গত সকল অঞ্চল ইসলামি শাসনের ছায়াতলে সমবেত হয় এবং সে অঞ্চলের প্রাচীন গােত্রসমূহ ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

আব্বাসীয় খলিফা এবং আমির-উমারার দরবারে তুর্কিদের সংখ্যা উল্লেখযােগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। তারা সাম্রাজ্যের সামরিক এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পেতে শুরু করে। তাই তাদের মধ্য হতে সৈনিক, সেনাপতি এবং কাতেব পদে নিযুক্ত বহু লােক ছিল। তারা ধীরস্থিরতা এবং আনুগত্য আঁকড়ে ধরে একপর্যায়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চ পদ অর্জন করে।

মু'তাসিম আব্বাসি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনি তুর্কিদের কর্তৃত্বের দুয়ার খুলে দেন এবং সাম্রাজ্যের বড় বড় দায়িত্বগুলাে তাদের কাঁধে ন্যস্ত করেন। এর মাধ্যমে তারা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার লাভ করে। খলিফা মু'তাসিম বিল্লাহর রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল পারসিকদের কর্তৃত্বের মূলােৎপাটন। খলিফা মামুনের শাসনামল থেকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ভিত মজবুত করার ব্যাপারে মু'তাসিম বিল্লাহর বিরাট অবদান রয়েছে।


তুর্কিদের প্রতি মু'তাসিম বিল্লাহর গুরুত্বপ্রদান জনগণ এবং সৈন্যদের মাঝে মারাত্মক ক্ষোভ সৃষ্টি করে। মু'তাসিম জনগণের ক্ষোভ ও বিরক্তি থেকে বাঁচতে বাগদাদ থেকে ১২৫ কিলােমিটার দূরবর্তী এক জায়গায় সামারা নামে একটি নতুন শহর নির্মাণ করেন। সেনাবাহিনী ও সহচরদের নিয়ে তিনি সেখানে বসবাস করতে থাকেন।

সে সময় থেকে এভাবেই তুর্কিরা ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একপর্যায়ে তারা বিশাল ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। আব্বাসীয় খিলাফতের সাথে তাদের মজবুত ও শক্তিশালী সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী সময়ে এই সাম্রাজ্যই ‘সেলজুক সাম্রাজ্য’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

লেখক: Akif Abdullah Nori.....


........উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস........ ____পর্ব:২_______

প্রসঙ্গ: উসমানী সাম্রাজ্য নিয়ে দুটি কথা..

উসমানিগণ হলেন একটি তুর্কি বংশােদ্ভূত।
হিজরি সপ্তম শতাব্দী তথা খ্রিষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে কুর্দিস্তানে তাদের বসবাস ছিল। তারা রাখালি পেশায় নিয়ােজিত ছিল। তাদের সময়কাল ছিল ইরাক এবং পূর্ব-এশিয়ায় চেঙ্গিজ খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলীয় আক্রমণের পরবর্তী সময়।


কেননা, উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমানের দাদা সুলাইমান ৬১৭ হিজরি মােতাবেক ১২২০ খ্রিষ্টাব্দে স্বীয় গােত্রের সাথে কুর্দিস্তান থেকে আনাতােলিয়া নামক এলাকায় হিজরত করেন। এরপর সেখানকার ‘আখলাত’ নামক শহরে স্থায়ীভাবে ৬২৮ হিজরি তথা ১২৩০ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যু হলে তার মেজ ছেলে ‘আরতুগ্রুল’ তার উত্তরসূরি হন।

তিনি আনাতােলিয়া থেকে আরও উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে আসেন। তখন তার সাথে ১০০ পরিবার এবং ৪০০-এর অধিক অশ্বারােহী ছিল।
যখন উসমানের পিতা আরতুগ্রুল মঙ্গোলীয়দের হামলা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তখন তার সাথে পরিবারের সংখ্যা ৪০০-এর অধিক ছিল না।
সেখানে তারা বিকট আওয়াজ শুনতে পান। আওয়াজের কাছাকাছি যেতেই তারা মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের মাঝে ব্যাপক লড়াই দেখতে পান।
তখন কনস্টান্টিনােপলের খ্রিষ্টানদের পাল্লা ভারী ছিল।
এ অবস্থা দেখে আরতুগ্রুল পুরাে শক্তি নিয়ে তার দ্বীনি ভাইদের সাহায্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

ফলে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের শক্তি ও সাহস উল্লেখযােগ্য পরিমাণে সঞ্চার হয়।
যুদ্ধের পর তৎকালীন ইসলামী 'সেলজুক সাম্রাজ্য' এর সেনাপতি আরতুগ্রুল এবং তার সাথীদের এ আবেদন স্বীকার করেন এবং এই অবদানের প্রতিদানস্বরূপ তিনি তাদের জন্য আনাজুলের পশ্চিম সীমান্তে রোমের পার্শ্ববর্তী একটি এলাকা বরাদ্দ করে দেন।
পাশাপাশি রুমের দিকে তাদের অঞ্চলকে সম্প্রসারণের সুযোগ করে দেন।
তাদের মাধ্যমে সেই চুক্তির আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সব চালিয়ে মিত্রবাহিনী এবং সহযোগী পেয়ে যায়।


সেলজুকদের এবং এই উক্তি সাম্রাজ্যের মাঝে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকে।
কারণ, ধর্ম এবং বিশ্বাসী তাদের উভয়ের শত্রু ছিল একই।
আরতুগ্রুলের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই সম্পর্ক বজায় ছিল।

৬৯৯ হিজরী তথা ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর তার ছেলে ওসমান তার উত্তরসূরি নির্বাচিত হন, যিনি রোম অঞ্চলে রাজত্ব সম্প্রসারণে তাতে কি তার নীতি অনুসরণ করেন।

লেখক: Akif Abdullah Nori...

................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:৩_______ প্রসঙ্গ: উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমান।

৬৫৬ হিজরী মোতাবেক ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে আরতুগ্রুলের ছেলে ওসমান জন্ম হয়।
তিনি যে বছর জন্মগ্রহণ করেন সে বছরই মঙ্গোলিয়ার হালাকু খাঁর নেতৃত্বে আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদে আক্রমণ করে।
এটি ছিল বেশ বড় এবং মর্মান্তিক একটি দুর্যোগ।

যাই হোক মূল কথায় আসি:

প্রথম উসমানের নেতৃত্বসুলভ উল্লেখযােগ্য গুণাবলি।

প্রথম উসমানের জীবন নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের সামনে তার ব্যক্তিত্বের কয়েকটি গুণ ভেসে ওঠে। যেমন : তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি, বিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

তার সবচেয়ে গুরুত্ববহ এবং উল্লেখযােগ্য গুণাবলি হচ্ছে—

১/ বীরত্ব:

৭০০ হিজরি মােতাবেক ১৩০১ খ্রিষ্টাব্দে কনস্টান্টিনােপলের বুরুসা, মাদানুস, আদ্রানুস, কাত্তাহ, কাস্তালাহ প্রভৃতি অঞ্চলের খ্রিষ্টান রাজারা উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমান বিন আরতুগ্রুলের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের ডাক দেয়।
খ্রিষ্টানরা এতে ব্যাপকভাবে সাড়া দেয় এবং এই উঠতি সালতানাতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শপথ গ্রহণ করে। উসমান তার সৈন্যদল নিয়ে এগিয়ে যান। যুদ্ধের ময়দানে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করে তিনি ক্রুসেড-যােদ্ধাদের বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তার বীরত্ব উসমানিদের কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ হয়ে যায়।

২/ হিকমত বা প্রজ্ঞা:

স্বীয় গােত্রের নেতৃত্ব হাতে নেওয়ার পর তিনি ভেবে দেখলেন, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সুলতান আলাউদ্দিনের সাথে মিলিত হয়ে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অবস্থান করা বুদ্ধির কাজ হবে।
তাই তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং দুর্গ-জয়ে সুলতানকে সাহায্য করেন।
এর ফলে তিনি রােমের সেলজুক সুলতান আলাউদ্দিনের দরবারে আমির হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন।
তিনি তার অধীন অঞ্চলে সুলতানের নামে মুদ্রা চালু করেন এবং জুমার খুতবায় তার নামে দোয়া চালু করেন।

৩/ ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা:

উসমানের নেতৃত্বাধীন অঞ্চলের আশপাশের লােকেরা দ্বীনের জন্য তার ইখলাস এবং একনিষ্ঠতা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তারা ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে তার সমর্থন এবং তার সাথে অবস্থান করে ইসলাম এবং মুসলিমদের শত্রুদের বিরুদ্ধে মজবুত প্রাচীররূপে দাঁড়ানাের সিদ্ধান্ত নেন।"

৪/ সবর তথা ধৈর্য:

যখন তিনি বিভিন্ন দুর্গ এবং শহর জয় করা শুরু করেন, তখন তার এই গুণটি প্রকাশ পেতে শুরু করে। ৭০৭ হিজরিতে তিনি কাত্তাহ, লাফকাহ, আক্তে হিসার এবং কওজে হিসার দুর্গ জয় করেন। আর ৭১২ হিজরিতে কাবওয়াহ, ইয়াকিজাহ তােরাকু এবং তাকাররুর বিকারি দুর্গ জয় করেন। ৭১৭ হিজরি মােতাবেক ১৩১৭ খ্রিষ্টাব্দে বুরুসা জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি বিজয়যাত্রার শীর্ষচূড়ায় উঠেছিলেন।
কয়েক বছরব্যাপী দীর্ঘ অবরােধের পর এই জয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হন তিনি। বুরুসা জয় করা কোনাে সহজসাধ্য কাজ ছিল না।
বলা যায়, উসমানের অভিযানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ছিল এটি। এ সময় উসমান এবং বুরুসার অধিপতি ইকরিনুসের মাঝে কয়েক বছরব্যাপী কঠিন যুদ্ধ হয়। অবশেষে বুরুসার অধিপতি আত্মসমর্পণ করে উসমানের হাতে শহর তুলে দেয়।আল্লাহ তাআলা বলেন-
يايها الذين امنوا اصبروا وصابروا
و رابطوا واتقوا الله لعلكم تفلحون..
“হে মুমিনগণ, তােমরা ধৈর্যধারণ করাে, তার ওপর অটল থাকো এবং পরস্পর সম্পর্ক স্থাপন করে। আর আল্লাহকে ভয় করাে, যাতে তােমরা সফলকাম হও।' [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ২০০]

৫/ ঈমানী জজবা:

বুরুসার অধিপতি ইকরিনুসের সাথে যুদ্ধের সময় তার এই গুণের কথা জানা যায়।
যুদ্ধ শেষে ইকরিনুস ইসলাম গ্রহণ করে। সুলতান উসমান তাকে ‘বেক’ উপাধি প্রদান করেন। এরপর সে উসমানি সালতানাতের প্রথম সারির সেনাপতিদের কাতারে পৌঁছে যায়। অনেক কনস্টান্টিনােপলিয়ান সেনাপতি উসমানের ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত ছিলেন। তারা উসমানের দেখিয়ে যাওয়া পথ অনুকরণ করে উসমানি সালতানাতকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।

তখন অনেক মুসলিম সৈন্যদল উসমানি সালতানাতের পতাকাতলে একতাবদ্ধ হয়। তাদের মধ্যে ছিল গাজিয়ারােম অর্থাৎ রােমের একদল যােদ্ধা। তারা হলাে এমন একটি মুসলিম সৈন্যদল, যারা আব্বাসীয় খিলাফতের সময় থেকে রােম সীমান্তে একতাবদ্ধভাবে অবস্থান করত এবং মুসলিমদের ওপর রােমীয়দের আক্রমণ প্রতিহত করত। তাদের এই পারস্পরিক সম্প্রীতি রােমের। যুদ্ধে তাদেরকে আলাদা মর্যাদা দান করে। এতে করে ইসলামের ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটে এবং ইসলামি নিয়মকানুনের প্রসার ঘটে।

আরেকদল ছিল ইখওয়ান, অর্থাৎ ভাইদের দল। তারা ছিল অত্যন্ত ভালাে একটি দল, যারা মুসলিমদেরকে সাহায্য করত, তাদের মেহমানদারি করত এবং যােদ্ধাদের সেবা করার জন্য সৈন্যদলের সাথে অবস্থান করত। এই দলের সিংহভাগ লােক ছিলেন ব্যবসায়ী। তারা ইসলামের খেদমতের জন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। যেমন : মসজিদ, সরাইখানা ইত্যাদি নির্মাণ করা। উসমানি সালতানাতে তারা বেশ মর্যাদার আসনে আসীন ছিলেন। এই দলগুলাের মধ্যে একদল বিজ্ঞ আলেম ছিলেন; যারা ইসলামি সভ্যতার বিস্তৃতি এবং প্রচার-প্রসারে কাজ করেছেন। লােকদের ধর্মীয় জীবনযাপনে আগ্রহী করেছিলেন। আরেকদল ছিল হাজিয়াতে রােম, অর্থাৎ রােমের হাজিদের কাফেলা। ইসলামি ফিকহ নিয়ে কাজ করত আরেকটি দল। তারা শরিয়তের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গবেষণা করতেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, সাধারণ মুসলিমদের সাহায্য করা। বিশেষত মুজাহিদদের সাহায্য করা। এ ছাড়া আরও অন্যান্য দলের লােকেরাও ছিল।

৬/ ন্যায়পরায়ণতা:

অধিকাংশ তুর্কি ইতিহাসগ্রন্থ হতে জানা যায়, ৬৮৩ হিজরি মােতাবেক ১২৮৫ হিজরিতে কনস্টান্টিনােপলের খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে কুরুহজাহ দুর্গ জয় করার পর আরতুগ্রুল তার ছেলে উসমানের হাতে সে অঞ্চলের শাসনভার ন্যস্ত করেছিলেন। তখন উসমান তুর্কি মুসলিমদের বিপরীতে কনস্টান্টিনােপলের খ্রিষ্টানদের শাসন করেছিলেন। এতে অভিভূত হয়ে এক খ্রিষ্টান উসমানকে জিজ্ঞেস করেছিল, কীভাবে আপনি আমাদের কল্যাণ সাধন করেন, অথচ আমরা আপনার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী?
উসমান জবাব দিয়েছিলেন:
আমি কেনই বা তোমাদের কল্যাণ কামনা করব না!
আমার তো আল্লাহ তাআলার ইবাদত করি তিনি আমাদেরকে বলেছেন:
ان الله يامركم ان تؤدوا الامانات الى اهلها
واذا حكمتم بين الناس ان تحكموا بالعدل"
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন,
তোমরা আমানতকে তার হকদ্বারের কাছে পৌঁছে দাও এবং ন্যায়পরায়ণতার সাথে শাসন করো"
-------সূরা নিসা: আয়াত: ৫৮------

তারেই ন্যায়পরায়ণতার কারণে লকটি তার গোত্র সহ ইসলাম গ্রহণ করে।

৭/ বিশ্বস্ততা:

অঙ্গীকার রক্ষা করাকে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। কনস্টান্টিনােপলের উলুবাদ দুর্গের অধিপতি উসমানি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার সময় শর্ত দিয়েছিল, পুলের ওপর দাঁড়ানাে কোনাে মুসলিম-সৈন্য যেন দুর্গে প্রবেশ না করে। তিনি তা মেনে নিয়েছিলেন। আর এভাবে তার পরবর্তীরাও এ মন নিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন-
واوفوا بالعهد. ان العحد كان مسؤلا"
"তোমরা অঙ্গীকার পূরণ করো, নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে"

আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা:

তার বিজয় অভিযানগুলাে একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হতাে।
তার শাসন এবং বিজয় অভিযানসমূহ কোনাে অর্থনৈতিক অথবা সামরিক ফায়েদার উদ্দেশ্যে ছিল না; বরং তা ছিল আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া এবং তার দ্বীন প্রচার করা।

এ জন্যই ইতিহাসবিদ আহমদ রফিক তার গ্রন্থ আত-তারিখুল আম্মিল কাবির-এ তাঁর সম্পর্কে বলেন- উসমান ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের ধর্মভীরু। তিনি জানতেন ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং তাকে সর্বজনীন করা একটি পবিত্র আবশ্যক কাজ। তিনি ছিলেন দূরদর্শী এবং দৃঢ় রাজনৈতিক চিন্তাবিদ।

তিনি সুলতান হওয়ার লােভে তার সালতানাতের প্রতিষ্ঠা করেননি; বরং ইসলামের প্রচারের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। মিসর উগুলাে বলেন- উসমান বিন আরতুগ্রুল ছিলেন খাঁটি ইমানের অধিকারী। আল্লাহর কালিমাকে উঁচু করাই ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
তিনি তার সকল শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তৎপর ছিলেন।

এগুলাে ছিল প্রথম উসমানের কিছু উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলার প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস, আখেরাত দিবসের জন্য তার প্রস্তুতি, আহলে ইমানের প্রতি তার ভালােবাসা, কাফের এবং পাপীদের প্রতি তার ঘৃণা, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর প্রতি তার গভীর মহব্বত এবং সেদিকে আহ্বান করার মতাে আরও এমন মহৎ সব গুণে তিনি ছিলেন গুণান্বিত।

এ জন্যই উসমান এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বিজয় অভিযানের সময় রােমের আমিরদেরকে তিনটির যেকোনাে একটি শর্ত গ্রহণ করতে বলেছিলেন।
এক, হয়তাে তারা ইসলাম গ্রহণ করবে।
দুই, অথবা জিজিয়া প্রদান করবে।
তিন. অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে।
তাই তাদের কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করেছে।

কেউ দ্বিতীয় শর্ত গ্রহণ করে জিজিয়া দিতে রাজি হয়েছে।
আর বাকিদের বিরুদ্ধে কোনাে আপােষ না করে তিনি জিহাদে নেমেছেন এবং বিজয় ছিনিয়ে এনে তার রাজত্বের সাথে বিশাল একটি এলা সংযুক্ত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা এবং আখেরাতের প্রতি অটুট ইমান থাকার ফলে উসমানের ব্যক্তি ছিল মুগ্ধকর এবং সুষমামণ্ডিত।
এ জন্যই তার শক্তি কখনাে তার ইনসাফকে, রাজত্ব তার দয়াকে এবং তার ধনাঢ্যতা তার বিনয়কে পরাভূত করতে পারেনি।


তিনি আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাকে ক্ষমতার উপক এবং বিজয়ের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন।
এ ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দা উসমানের প্রতি অনুগ্রহ।

আল্লাহ এশিয়া মাইনর অঞ্চলে তাকে ক্ষমতা এবং শক্তি প্রয়ােগের সুযােগ দিয়েছেন।
রাজত্ব পরিচালনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, অধিক সৈন্যসংখ্যা এবং গাম্ভীর্য দান করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলার রক্ষণাবেক্ষণ ছিল তার জন্য বিরাট অনুগ্রহস্বরূপ।
আল্লাহ তাআলা তার জন্য তাওফিকের দরজা খুলে দিয়েছিলেন এবং তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেছিলেন।

আল্লাহর পথে আহ্বান করাকে তিনি ভালােবাসতেন।
তাই তার সকল কাজ ছিল মহান।
তিনি তরবারির মাধ্যমে যেমন দেশ বিজয় করেছেন, তেমনই ইমান ও ইহসানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়রাজ্যও দখল করেছেন।
যখনই কোনাে জাতির ওপর তিনি বিজয়লাভ করতেন, তখনই।
তাদেরকে সত্যের প্রতি এবং আল্লাহ তাআলার ওপর ইমান আনার আহ্বান জানিয়েছেন। বিজিত সকল প্রদেশ এবং শহরে আত্মশুদ্ধিমূলক কাজের ব্যাপারে তিনি খুব আগ্রহী ছিলেন।
ইমানদারদেরকে তিনি যেমন ভালােবাসতেন, ঠিক তেমনই সম্মানও করতেন।
বিপরীতে কাফেরদের প্রতি ছিলেন কঠোর।

লেখক: Akif Abdullah Nori...

................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:৪_____ প্রসঙ্গ:উসমানি শাসকগণ যে নীতি মেনে চলেছিলেন।

উসমানি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা উসমানের পুরাে জীবনই ছিল আল্লাহর পথে দাওয়াত এবং জিহাদের জন্য নিবেদিত।
ধর্মীয় আলেমগণ আমিরকে ঘিরে রাখতেন এবং তাকে তার প্রশাসনিক রূপরেখা এবং শরয়ি হুকুম অনুযায়ী রাজত্ব চালানাের জন্য সম্মান করতেন৷ মৃত্যুর বিছানায় শুয়ে উসমান তার ছেলে উরখানকে যে অসিয়ত করেছিলেন তা ইতিহাস আমাদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছে।


তার এই অসিয়তই ছিল একটি সভ্যতামূলক নির্দেশনা এবং শরয়ি মানহাজস্বরূপ।
পরবর্তী উসমানি শাসকগণও তা মেনে চলেছেন। তিনি তার অসিয়তে বলেছিলেন

• প্রিয় সন্তান আমার, আল্লাহ তােমাকে যে কাজের আদেশ করেননি তা করা থেকে তুমি বিরত থাকবে। শাসনকার্যের ক্ষেত্রে কোনাে সমস্যার সম্মুখীন হলে উলামায়ে কেরামের পরামর্শকে আশ্রয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করবে। । প্রিয় সন্তান, তােমার অধীনদের যথাবিহীত সম্মান করবে। সৈন্যদলের প্রতি অনুগ্রহ করবে। তােমার সৈন্য এবং সম্পদের মাধ্যমে যেন শয়তান তােমাকে ধোঁকা দিতে না পারে। আহলে শরিয়ত থেকে দূরে থাকা থেকে বেঁচে থাকবে। হে পুত্র, নিশ্চয় তুমি জানাে, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ রাব্দুল আলামিনকে খুশি করা। তাই যা বলবে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে বলবে। প্রিয় পুত্র, যারা শাসনের লােভে এবং একক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে যুদ্ধ করে আমরা তাদের দলভুক্ত নই। আমরা ইসলামের জন্যই বাঁচব, ইসলামের জন্যই মরব। হে সন্তান, এটার জন্যই তুমি যােগ্য।

আত-তারিখুস সিয়াসি লিঙ্ক্ষাওলাতিল উলিয়াতিল উসমানিয়্যাহ গ্রন্থে তার অসিয়তের আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তা হলাে—

হে বৎস, নিশ্চয় ইসলাম প্রচার করা, তার দিকে লােকদেরকে আহ্বান করা এবং মুসলিমদের সম্মান ও সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করা তােমার কাঁধে আমানত। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তােমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।]

মাঅসাতে বনি উসমাননামক গ্রন্থে অসিয়তের আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তা হলাে—

• প্রিয় পুত্র, আমি আমার প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যাচ্ছি। আর আমি তােমাকে নিয়ে গর্ব করি। নিশ্চয় তুমি তােমার প্রজাদের প্রতি ন্যায়পরায়ণ হবে। ইসলাম প্রচারের জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যহত রাখবে।

হে পুত্র, আমি তােমাকে অসিয়ত করছি, তুমি সর্বদা উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে থাকবে। অধিক পরিমাণে তাদেরকে সম্মান করবে। তাদের পরামর্শ গ্রহণ করবে। কেননা, তারা সবসময় কল্যাণের কথাই বলেন।

হে পুত্র, আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কোনাে কাজ কখনাে করবে না। যখন কোনাে বিষয় তােমার কাছে কঠিন মনে হবে, তখন শরিয়তের আলেমগণকে জিজ্ঞাসা করবে। কেননা, তারা তােমাকে অবশ্যই কল্যাণের দিক-নির্দেশনা প্রদান করবেন। আর জেনে রাখাে হে পুত্র, এই দুনিয়াতে আমাদের সকলের পথই এক। আর সেটি হলাে আল্লাহ তাআলার পথ। আর আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা কোনাে সুখ্যাতি অর্জন বা দুনিয়া অন্বেষণকারী নই)।

[৮৫ তারিখে উসমানিতে উসমানের অসিয়তের আরেকটি বিবরণ পাওয়া যায়-

আমার পুত্র এবং বন্ধুদের প্রতি আমার অসিয়ত হচ্ছে, তােমরা সর্বদা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মাধ্যমে ইসলামকে উন্নীত রাখবে। সবচেয়ে পরিপূর্ণ জিহাদের মাধ্যমে তােমরা সম্মানিত ইসলাম ধর্মের পতাকাকে উড্ডীন করে রাখবে। সর্বদা ইসলামের খেদমত করবে। কেননা, আল্লাহ তাআলা আমার মতাে দুর্বল বান্দাকে দেশ বিজয়ের জন্য নিয়ােজিত করেছেন। তাই তােমরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মাধ্যমে ইসলামকে দূরদূরান্তের দেশে নিয়ে যাবে। আর আমার বংশধরদের থেকে যারা সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হবে, তারা হাশরের দিনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফাআত থেকে বঞ্চিত হবে। হে আমার পুত্র, দুনিয়াতে এমন কেউ নেই, যে মৃত্যুর সামনে তার গর্দান অবনত করে না। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি তােমার হাতে এই সাম্রাজ্য তুলে দিচ্ছি আর তােমাকে মাওলার কাছে গচ্ছিত রাখছি। তােমার সকল কাজে ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করবে।

৮৬] এই অসিয়তই ছিল একটি আদর্শ রূপরেখা। উসমানি শাসকেরা এই আদর্শের ওপরেই চলেছেন। তাই তারা ইলম, ইলমি প্রতিষ্ঠান, সৈন্যদল এবং সেনা প্রতিষ্ঠানের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। উলামায়ে কেরাম এবং তাদের সম্মানের প্রতিও গুরুত্বারােপ করেছেন। আরও গুরুত্বারােপ করেছেন জিহাদের প্রতি, যা মুসলিম সেনাবাহিনীর পতাকাকে দূরদূরান্তে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া তারা ইনসাফের শাসনব্যবস্থার প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন।
সেই অসিয়তের মধ্য হতে যে মূলনীতিগুলাের ওপর ভিত্তি করে উসমানি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

লেখক: Akif Abdullah Nori...

................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:৫_____ প্রসঙ্গ:"সুলতান উরখান ইবনে উসমান [৭২৭-৭৬১ হিজরি/১৩২৭-১৩৬০ খ্রিষ্টাব্দ]"

উসমানের মৃত্যুর পর রাজত্বের অধিপতি হন তার ছেলে উরখান। শাসন এবং বিজয় অভিযানসমূহের ক্ষেত্রে তিনি তার পিতার নীতিই মেনে চলেছেন।
৭২৭ হিজরি মােতাবেক ১৩২৭ খ্রিষ্টাব্দে তার হাতে ‘নিকুমিদিয়া’র পতন হয়, যা এশিয়া মাইনরের পশ্চিমে কনস্টান্টিনোপল বর্তমান "ইস্তাম্বুল"শহরের নিকটবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত বর্তমান ‘ইজমির’ শহর। তিনি দাউদ আল-কায়সারির হাত থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি উসমানি সাম্রাজ্যের সে সকল আলেমদের একজন; যারা মিসরে পড়াশােনা করেছেন।
তিনি সমসাময়িক কাঠামাে অনুযায়ী তার সেনাবাহিনী গঠনে গুরুত্বারােপ করেছিলেন এবং একটি সুসংহত, শৃঙ্খলাবদ্ধ সেনাবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কনস্টান্টিনােপল বিজয়ের যে সুসংবাদ দিয়েছিলেন সুলতান উরখান তা বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়েছিলেন। তাই তিনি একই সময়ে তার রাজ্যের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্ত হতে ‘বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানীর সীমানা পর্যন্ত একটি কৌশলগত রূপরেখা এঁকেছিলেন।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি তার ছেলে সুলাইমানকে দারদানিল প্রণালি অতিক্রম করে পশ্চিমপ্রান্তের এলাকাগুলােতে কর্তৃত্ব লাভের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন।
লেখক: Akif Abdullah Nori....

................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:৬_____ প্রসঙ্গ:"সুলতান উরখান ইবনে উসমান [৭২৭-৭৬১ হিজরি/১৩২৭-১৩৬০ খ্রিষ্টাব্দ]"

৭৫৮ হিজরি সনের একরাতে সুলাইমান দারদানিল প্রণালি অতিক্রম করেন।
তখন তার সঙ্গে ছিল ৪০জন মুসলিম অশ্বারােহী। পশ্চিম তীরে পৌঁছে তারা সেখানকার রাষ্ট্রীয় নৌবহরের ওপর আধিপত্য লাভ করেন।
এর মাধ্যমে তারা আবার পূর্ব তীরে ফিরে আসেন। তখন উসমানি সালতানাতের কোনাে নৌবহর ছিল না। কারণ, উসমানিদেন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার শুরুতে তাদের সাম্রাজ্যের স্থায়ীত্বের কোনাে নিশ্চয়তা ছিল না। পত্ন। তীরে পৌঁছে সুলাইমান নৌবহরে আরােহণ করে ইউরােপের তীরে যাওয়ার নির্দেশ সেখানেই তারা তারামুব’ কেল্লার বন্দর জয় করেন।
আরও জয় করেন ‘গালিয়ুবি’ বন্দর। যাতে রয়েছে ‘জানা কেল্লা’ দুর্গ, আবসালা’ দুর্গ এবং ‘রুদাস্তু’ দুর্গ। এর সবকটিই দারদানিল’ প্রণালির উত্তর থেকে দক্ষিণে অবস্থিত।
এই বিজয় অভিযানগুলাের মাধ্যমেই এই সুলতান একটি বিরাট পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যা তার পরবর্তীদের কনস্টান্টিনােপল বিজয়ে সহায়ক হয়েছে।

সুলতান উরখানের কার্যক্রমসমূহ ____এক_____ একটি নতুন সেনাবাহিনী গঠন"""""""""""""
সুলতান উরখানের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলাের একটি হচ্ছে, একটি নতুন ইসলামি সেনাবাহিনী গঠন করা এবং সেনাবাহিনীর জন্য বিশেষ নিয়মকানুন জারি করা।
তিনি সেনাবাহিনীকে কয়েকটি ইউনিটে বিভক্ত করেন। প্রত্যেকটি ইউনিটে ১০ জন অথবা ১০০ কিংবা ১হাজার করে সৈন্য ছিল।
গনিমত তথা যুদ্ধলব্দ সম্পদের পাঁচ ভাগের একভাগ সেনাবাহিনীর জন্য দেওয়ার অনুমােদন দিয়েছিলেন। তিনি একটি সার্বক্ষণিক সেনাবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
পূর্বে সেনাবাহিনী শুধু যুদ্ধের সময়েই একত্র হতাে। তিনি সেনাবাহিনীর জন্য কয়েকটি বিশেষ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন, যাতে তাদের পরিচর্যা সুষ্ঠু হয়। এভাবে তার সাথে তিনি আরেকটি সৈন্যদল মিলিত করেছিলেন, যা ‘জেনােসারি’ নামে পরিচিত ছিল।অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করে মুসলিমরা বিরাট বিরাট বিজয় লাভ করেছিলেন এবং তাদের রাজত্বের প্রশস্ততা বৃদ্ধি করেছিলেন।
এ সময় বহুসংখ্যক লােক ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের মাধ্যমেই সুলতান উরখান এই সৈন্যদল গঠন করেছিলেন।
এ সমস্ত বিজিত অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ লােক ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এরপর সুলতান তাদেরকে ইসলাম প্রচারের জন্য মুজাহিদিনদের দলের সাথে সম্পৃক্ত করে দিয়েছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ করার পর তাদের ইসলামি চিন্তা-চেতনা লালনের শিক্ষা এবং যুদ্ধের শিক্ষা লাভ হলে তারা বিভিন্ন অঞ্চলের সেনাবাহিনীর কেন্দ্রগুলােতে সহায়তায় নিয়ােজিত থাকত। তখনকার উলামায়ে কেরাম তাদের শাসক সুলতান উরখানের পাশে থেকে লােকদের অন্তরে জিহাদ, দ্বীনের বিরুদ্ধে আক্রমণ প্রতিহত করা এবং দ্বীনের সাহায্যে আগ্রহের প্রতি ভালােবাসার বীজ রােপণ করেছিলেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে অবতরণের পর তাদের উপাধি হতাে গাজি অথবা শহিদ। অধিকাংশ অমুসলিম ইতিহাসবিদ মনে করে, খ্রিষ্টানদের পরিবার থেকে তাদের শিশুদের ছিনিয়ে তাদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করতে বলা হতো। তাদেরকেই জেনােসাৰি সৈন্যদলে যুক্ত করা হতাে। আর তাদেরকে যে নিয়মনীতি মেনে চলতে বলা হতাে তার নাম ছিল “ নিজামে দাফশারিয়া।
তারা মনে করত, এই নিয়ম ইসলামি শরিয়াহর করের সাথে সম্পৃক্ত।
তারা এই করের নাম দিয়েছিল ‘জরিবাতুল গিলমান' অর্থাৎ বাচ্চাদের কর। কখনাে কখনাে তারা এটাকে ‘জরিবাতুল আনা' অর্থাৎ সন্তানদের কর-ও বলত। তারা মনে করত, এটি এমন কর, যা উসমানি মুসলিমদের জন্য প্রত্যেক খ্রিষ্টান শহর অথবা পল্লীর এক পঞ্চমাংশ শিশুদেরকে ছিনিয়ে নেওয়াকে বৈধ করেছিল। মুসলিমদের বাইতুল মালের গনিমতের পাঁচ ভাগের এক ভাগ দেওয়ার ওপর অনুমান করে।

সে সমস্ত বাস্তবতা বিকৃতিকারী ইতিহাসবিদদের মধ্যে ছিল কার্ল ব্রুকম্যান, জিওনাজ এবং জব; কিন্তু বাস্তবতা হলাে, তাদের ধারণাকৃত নিজামে দাসরাম বাদশাহ উরখান এবং তার পুত্র মুরাদ ইবনে উরখানের ইতিহাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যা বৈ আর কিছুই নয়। তাদের পরবর্তী সকল উসমানি শাসকদের ওপর থেকে তারা তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।

মূলত নিজামে দাসরামা প্রণয়ন করা হয়েছিল ওই সমস্ত খ্রিষ্টান শিশু শরণার্থীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য, যারা চলমান যুদ্ধের ফলে এতিম এবং গৃহহীন হয়ে গিয়েছিল। উসমানি সাম্রাজ্য যে নীতির ওপর চলেছে তা হলাে ইসলাম। তাদের দিকে অমুসলিম ইতিহাসবিদরা জারিকাতুল গিলমান নামে যা রটিয়েছে, তা স্পষ্টভাবে অগ্রাহ্য। উল্লেখযােগ্য সংখ্যার শিশুরাই যুদ্ধবিগ্রহের ফলে তাদের মা-বাবাকে হারিয়েছিল। তাই যে সমস্ত শিশু তাদের পিতা-মাতাকে হারিয়ে সেই বিজিত শহরের অলিগলিতে অসহায় হয়ে পায়চারি করত, উসমানি সাম্রাজ্য তাদের লালনপালনের ভার নিয়েছে। ভবিষ্যতে তাদের নিরাপত্তা এবং সম্মান নিশ্চিত করেছে ইসলাম ছাড়া আর কোনাে ধর্মে কি এই নীতি পাওয়া যাবে? উদভ্রান্ত শরণার্থী শিশুদের ইসলাম ধর্মে প্রবেশের ব্যাপারে উসমানি শাসকগণ আগ্রহী না হলে ওই বিকৃতিকারী ইতিহাসবিদরা কি এই অপবাদ দিতে পারত যে, মুসলিমরা খ্রিষ্টান শিশুদের তাদের পিতা-মাতার কোল থেকে ছিনিয়ে এনেছে এবং তাদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করতে বলেছে?

পরিতাপের বিষয় হলাে, এই হিংসাত্মক মিথ্যা, প্রকাশ্য অপবাদ এবং বিশাল মিথ্যাচারিতাকে কোনাে কোনাে মুসলিম ইতিহাসবিদ তাদের মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলােতে শিক্ষা দিয়ে থাকে, যেন এটি কোনাে স্বীকৃত বিষয়! শিক্ষার্থীদের তারা যেন জানিয়ে দিচ্ছে যে, এটি একটি বাস্তব ইতিহাস। অনেক মুসলিম ইতিহাসবিদঅমুসলিম ইতিহাসবিদদের গ্রন্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ ইসলামের ওপরে আত্মমর্যাদাবােধের সাক্ষ্য দেয়। তাই তারা বিভ্রান্ত হয়ে তাদের বইয়ে এসব মিথ্যা লিপিবদ্ধ করে।

যেমন : ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ ফরিদ বেক আল-মােহামি তার বই আন্দাওলাতুল উলিয়াতুল উসমানিয়্যাহ তে লিখেছেন। ড. আলি হুসুন তার গ্রন্থ তারিষু দাওলাতিল উসমানিয়্যাহ তে লিখেছেন। ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ কুরদ তার গ্রন্থ যুতাতুশ শামেলিখেছেন। ড, উমর আবদুল আজিজ তার গ্রন্থ মুহাজারাতুন ফি তারিখিশ শুয়াবিল ইসলামিয়্যাহ তে লিখেছেন। ড. আবদুল করিম গারাবিয়্যাহ আল-আরবু ওয়াল আতাক গ্রন্থে লিখেছেন। বাস্তবতা হলাে, তারা যে জরিবাতুল গিলমান এবং খ্রিষ্টান শহরের এক পঞ্চমাংশ শিশুকে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা লিখেছে, এ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের গ্রন্থ ছাড়া তাদের আর কোনাে দলিল নেই।

যেমন জব, খ্রিষ্টান ইতিহাসবিদ সােমােফিল, অথবা ব্রুকলিম্যান-এর গ্রন্থসমূহ। আর ইসলামি ইতিহাসের ব্যাপারে তাদের গ্রন্থ এবং তাদের উদ্দেশ্যের ওপরে কখনােই ভরসা করা যায় না। নিশ্চয় যাদেরকে জিহাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তারা কেউ খ্রিষ্টান ছিল না। তারা ছিল মুসলিম পিতা-মাতার সন্তান। যারা খ্রিষ্টানদের থেকে সরে এসে ইসলামের সঠিক পথপ্রাপ্ত হয়েছে। তারা তাদের নিজেদের ইচ্ছা এবং আনুগত্যেই এসেছে, জোরপূর্বকভাবে নয়। তারা তাদের সন্তানদেরকে সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দিত, যেন তাদের ইসলামি তালিম-তরবিয়ত পরিপূর্ণ হয়। আর বাকি যে সমস্ত এতিম এবং শরণার্থী শিশুরা থাকত, উসমানি সাম্রাজ্য তাদেরও লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেছিল। উরখান ইবনে উসমান যে নতুন সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি এমন শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈন্যদল গঠন করা, যারা যুদ্ধকালীন এবং অন্য সময়ে সমানভাবে সদা প্রস্তুত থাকবে। তিনি এই সৈন্যদল গঠন করেছিলেন তার পারিবারিক অশ্বারােহী এবং সে সমস্ত মুজাহিদগণের সমন্বয়ে, যারা জিহাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিতেন। তাদের সাথে ছিল রােমের সে সকল নেতৃবৃন্দ এবং সেনারা, যাদের অন্তরে ইসলামের সৌন্দর্য প্রবেশ করেছিল।

এই সৈন্যদল গঠনের সাথে সাথেই উরখান হাজি ‘বাকশ’ নামের একজন বড় আলেমের কাছে যান এবং তাকে বলেন, তিনি যেন এই সৈন্যদলের জন্য কল্যাণের দোয়া করেন। আলেম হাজি বাকতাশ তাদের সঙ্গে উত্তমরূপে সাক্ষাৎ করেন। একজন সৈন্যের মাথায় হাত রেখে তাদের জন্য। দোয়া করেন, যেন তাদের চেহারাগুলাে বিজয়ের রঙে রঙিন থাকে। তাদের তরবারিগুলাে হয় ক্ষুরধার, ধারালাে। আল্লাহর রাস্তায় তাদের প্রত্যেক যুদ্ধে যেন আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেন। তারপর তিনি সুলতান উরখানের দিকে মনােযােগী হয়ে বলেন, আপনি কি এই সেনাবাহিনীর কোনাে নাম রেখেছেন? তিনি বললেন, না। তখন আলেম বললেন, তাহলে সেই সৈন্যদলের নাম হবে,
"تشرى ىني"
অর্থাৎ "নতুন সেনাবাহিনী"।

লেখক: Akif Abdullah Nori....

................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:৭______

আল-জাইশুল জাদিদের পতাকা ছিল লাল রংয়ের। যার মধ্যভাগে ছিল চাঁদ। চাঁদের। নিচে ছিল একটি তরবারি। যার মধ্যে লেখা ছিল ‘জুলফিকার'। উদ্দেশ্য ছিল হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর তরবারির নামের বরকত লাভ।

উরখানের ভাই আলাউদ্দিন বিন উসমান ছিলেন বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তিনি শরিয়তের আলেম ছিলেন এবং দুনিয়াত্যাগী সঠিকপন্থার সুফি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। জিহাদের অনুসারী এবং বাইজেন্টাইনদের বিরােধ বেড়ে যাওয়ার পর উরখান তার আল-জাইশুল জাদিদের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধিতে মনােযােগী হন। তাই তিনি কিছু তুর্কি যুবক নির্বাচিত করেন আর কিছু বাইজেন্টাইন যুবক নির্বাচিত করেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং তাদের ইসলাম পাকাপােক্ত হয়েছিল। তিনি তাদেরকে মূল সেনাবাহিনীর সাথে যুক্ত করেন এবং তাদেরকে ইসলামি জিহাদের প্রশিক্ষণ প্রদানে গুরুত্বারােপ করেন। এভাবে তাদের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই থাকে। একসময় আল্লাহর রাস্তায় হাজার হাজার মুজাহিদ প্রস্তুত হয়ে যায়।

উরখান এবং আলাউদ্দিন দুজনেই আল-জাইশুল জাদিদের গঠনকে রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদে এবং তাদের অধীন এলাকার বিস্তৃতিতে এটিই হবে প্রধানতম উপকরণ। এর মাধ্যমে যে সমস্ত বাইজেন্টাইনরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাদেরকে ইসলামি জিহাদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের অন্তরে ইসলামের নিয়মকানুন গেঁথে দেওয়ার পর তাদের দ্বারাও ইসলাম প্রচার করানাে যাবে।

সারকথা হলাে, সুলতান উরখান কোনাে খ্রিষ্টান শিশুকে তার পিতৃগৃহ থেকে ছিনিয়ে আনেননি। কোনাে খ্রিষ্টান সন্তানকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেননি। ব্রুকলিম্যান, জব, জিওনাজ প্রমুখ ব্যক্তিরা যা ধারণা করেছে তা মিথ্যা ও বানােয়াট তথ্য। আমাদের ইসলামি ইতিহাস থেকে এগুলাের চিহ্ন মুছে ফেলা উচিত।


প্রত্যেক আত্মসম্মানবােধসম্পন্ন মুসলিম বিশেষভাবে আলেম-উলামা, ইতিহাসবিদ, শিক্ষক, আলােচক এবং বিশেষজ্ঞদের কাছে ইসলামি ভ্রাতৃত্ব এবং ইসলামি জ্ঞানের দাবি হলাে, উসমানিদের নামের সাথে যুক্ত এই মিথ্যা এবং সন্দেহপূর্ণ বিষয়গুলাে মুছে দেওয়া। অবস্থা এমন হয়ে গেছে, যেন এগুলাে আসলেই বাস্তব; এ ব্যাপারে কোনাে তর্ক-বিতর্ক, তথ্যসূত্র এবং আলাপ-সালাপ গ্রহণ করা যাবে না।

লেখক: Akif Abdullah Nori....

................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:৮______ সুলতান উরখান তার লক্ষ্য বাস্তবায়ন:

উরখানের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতি

উরখানের যুদ্ধগুলাে ছিল রােমকে উদ্দেশ্য করে।
যে বছর তাদের একজন শাসক “কুরাহসি’ মারা যায় সে বছরে এ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়।
(৭৩৬ হিজরি-১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দ)।

সে ছিল ওই সমস্ত শাসকদের একজন, রােমের হাতে সেলজুকদের রাজত্বের ভাঙনের ক্ষেত্রে যাদের ভূমিকা ছিল।
তার মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে বিবাদে লিপ্ত হয়। রাজত্ব দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। উরখান এই সুযােগের সদ্ব্যবহার করে তাদের বিবাদে অনুপ্রবেশ করেন এবং শেষপর্যন্ত তাদের রাজত্বের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করতে সক্ষম হন। উদীয়মান উসমানি সাম্রাজ্যের অন্যতম লক্ষ্য ছিল—এশিয়া মাইনর অঞ্চলে রােমের দখল করা সেলজুকীয় রাজত্বের অধিপতি হওয়া।তাদের অধীন সমস্ত অঞ্চলের মালিক হওয়া। এ জন্য তাদের মাঝে এবং অন্যান্য সাম্রাজ্যের মাঝে লড়াই চলতেই থাকে। এরপর সুলতান মুহাম্মদ
আল-ফাতিহের যুগ আসে আর পুরাে এশিয়া মাইনর অঞ্চল তার সামনে মাথা ঝােকাতে বাধ্য হয়।

উরখান তার সাম্রাজ্যের স্তম্ভকে মজবুত করা, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী এবং আবাদমূলক কার্যক্রম, প্রশাসনিক বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন। সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেছেন। এর সাথে সাথে বহু মসজিদ এবং বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন।

সেগুলাের তত্ত্বাবধানে রেখেছেন আলেম এবং শিক্ষকগণকে। তারা সাম্রাজ্যে অত্যন্ত সম্মানিত বলে বিবেচিত হতেন। প্রত্যেকটি গ্রামেই মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রত্যেকটি শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, যাতে নাহু-সরফ, তারকিবে লুগাওয়ি অর্থাৎ ভাষাগত গঠনপ্রণালি, মানতেক অর্থাৎ তর্কশাস্ত্র, মিথলজি, ফিকহুল লুগাত শাস্ত্র, ইলমুল বাদি ও বালাগাত তথা অলংকারশাস্ত্র, প্রকৌশলবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিদ্যা শেখানাে হতাে।


আর আবশ্যিকভাবে ছিল হিফজুল কুরআন এবং কুরআনের যাবতীয় জ্ঞানের শিক্ষা, সুন্নাহ, ফিকহ তথা মাসআলা এবং আকাইদ তথা আকিদা-বিশ্বাসের শিক্ষা।

সুলতান উরখান কুরাহ সির (যেটা কুরুলুসে আপনারা কুলাজাহিসার দেখেছেন) রাজত্ব অধীন করে ২০ বছর কোনাে যুদ্ধ না করেই কাটিয়েছিলেন। এ সময়ে তিনি শহরের আইনকানুন গঠন এবং সৈন্যব্যবস্থা আরও দৃঢ় করার প্রতি মনােনিবেশ করেন। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেন। মসজিদ নির্মাণ করে তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সাধারণদের জন্য ব্যাপকভাবে সরকারি সুবিধা প্রদান করেন, যা উরখানের মহত্ত্ব এবং তাকওয়া, তার বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় প্রদান করে।

তিনি যে সমস্ত এলাকা অধীন করেছেন তাতে তার মাকে সম্মানিত করতে চেয়েছেন। প্রত্যেক নতুন অধীন এলাকাকে তিনি শহুরে ব্যবস্থাপনা, সামরিক নিরাপত্তা এবং শিক্ষা-সভ্যতায় উন্নত করতে চেয়েছেন। তাই তার সাম্রাজ্যের অণু পরিমাণ অংশকেও পৃথক করা সম্ভব হয়নি। এর ফলাফল ছিল তার সাম্রাজ্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলে একটি সুসংহত এবং দৃষ্টান্তমূলক রাজত্বে পরিণত হয়। এতে করে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা, সুসভ্যতার বিকাশ এবং বিভিন্ন অঞ্চল আবাদে উরখানের পরিপূর্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। একদিকে উরখান তার রাজত্বের অভ্যন্তরীণ অবস্থা মজবুত করেন অপরদিকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিবাদের সূত্রপাত হয়।

তখন সম্রাট ""কুন্তাকুরিনুস"" সুলতান উরখানের কাছে তার বিরােধীদের মােকাবেলায় সাহায্য কামনা করেন। তাই উরখান ইউরােপ অঞ্চলে উসমানিদের ভিত মজবুত করতে উসমানি সৈন্যশক্তি প্রেরণ করেন। ১৩৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তুরাকিয়া অঞ্চলে ভূমিকম্প ঘটে। এতে গালিয়ুবির সীমান্ত ধ্বসে গেলে তার অধিবাসীরা সেখান থেকে সরে যায়। ফলে উসমানিদের জন্য তাতে প্রবেশ করা সহজ হয়ে যায়।

উরখানের বাহিনীকে প্রতিহত করার আগেই আল্লাহর সাহায্যে তার বাহিনীর সামনে শহরের সদর দরজা খুলে যায়। গালিয়ুবি হয়ে যায় ইউরােপ অঞ্চলে উসমানিদের অধিকৃত প্রথম অঞ্চল। এখান থেকেই প্রথম দিকের অভিযানগুলাে শুরু হয়, যা শেষে বলকান অঞ্চলকে অধিকৃত করার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।

বাইজেন্টাইন সম্রাট পঞ্চম বাল্যুলুজিস যখন একক রাজত্ব পরিচালনা করেন, তখন ইউরােপ অঞ্চলে উরখানের প্রতিটি বিজিত এলাকা সুগঠিত হয়। এভাবে সেখানকার শাসকের মােকাবিলায় কনস্টান্টিনােপলে খাদ্যদ্রব্য এবং সাহায্য পৌছানাে সহজ হয়ে যায়। সে অঞ্চলে উরখান ইসলামের দিকে আহ্বান করার জন্য উল্লেখযােগ্য সংখ্যক মুসলিমগােত্র প্রেরণ করেছিলেন।
আর ইউরােপ অঞ্চলে উসমানিদের এলাকায় খ্রিষ্টানদের বসবাস নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন।

সুলতান উরখানক তার লক্ষ্য বাস্তবায়ন:

যে সমস্ত উপকরণ সুলতান উরখানকে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সাহায্য করেছিল--—

১) সুলতান উরখান তার পিতা উসমান থেকে উপকার লাভ এবং মৌলিক ও নৈতিক যােগ্যতা লাভ করেন, যা তাদেরকে বাইজেন্টাইন আনাতােলিয়া শহর বিজয়ে এবং সেখানে তাদের আধিপত্য বিস্তারে সাহায্য করেছে। রাজত্বের প্রশস্ততা বৃদ্ধি এবং সীমানার প্রসারণে উরখান তার যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলাের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। উসমানি সাম্রাজ্য সমুদ্র অতিক্রম করে গালিয়ুবি অধিকৃত করার পরেই খ্রিষ্টানরা উসমানিদের কার্যক্রম সম্পর্কে টের পায়।

২) উসমানিরা যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে আলােচিত ছিল। তারা একই কাতারে, একই লক্ষ্যে, একই ধর্মমত মেনে লড়াই করত, যা সমাপ্ত হয়েছে তাদের মাঝে এবং বলকান উপত্যকার মাঝে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।

৩) বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অবসাদের গভীরে তলিয়ে যাওয়া। তখন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে স্পর্শ করেছিল রাজনৈতিক বিভক্তি এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অবনতি। তাই উসমানিদের জন্য তাদের সাম্রাজ্যে এই অঞ্চলকে যুক্ত করে নেওয়া সহজ ছিল।

৪) খ্রিষ্টানদের দুর্বল অবস্থা, যা মূলত ঘটেছিল বাইজেন্টাইন, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া ও হাঙ্গেরির শাসকদের মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাস না থাকায়। এ জন্য অধিকাংশ অঞ্চলে রাজনৈতিক এবং সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণে বিঘ্ন ঘটে। উসমানিদের বিপরীত দিকে তাদের অবস্থানের কারণে।

৫) রােম এবং কনস্টান্টিনােপলের মাঝে ধর্মীয় বিরােধ, অর্থাৎ ক্যাথলিক এবং অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের মাঝে বিরােধ, স্থায়ী হয়েছিল এবং উভয় দলের শিকড়ে ক্ষতির বিরাট চিহ্ন গেঁথে দিয়েছিল।

৬) ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি নতুন সামরিক শৃঙ্খলাবিধি এবং তাদের জন্য শিক্ষাপদ্ধতি প্রণয়ন। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্য এবং এ ব্যাপারে উসমানিদের। মধ্যকার সবচেয়ে বিচক্ষণ নেতাদেরকে এর তত্ত্বাবধানে নিয়ােজিত করা।

লেখক: Akif Abdullah Nori....

................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:৯______ সুলতান উরখান এর ছেলে সুলতান প্ৰথম মুরাদ [৭৬১-৭৯১হিজরি/১৩৬০-১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দ]

সুলতান প্রথম মুরাদ ছিলেন একজন বীর, মুজাহিদ, সম্মানিত এবং ধার্মিক ব্যক্তি।
আপনি জানলে অবাক হবেন!
তিনি নিয়ম-শৃঙ্খলা ভালােবাসতেন এবং তা আঁকড়ে ধরে রাখতেন। তার প্রজা এবং সৈন্যদের প্রতি ইনসাফ করতেন।

যুদ্ধের প্রতি এবং মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণের প্রতি আগ্রহী ছিলেন।

তার পাশে ছিল বিচক্ষণ নেতৃবৃন্দ এবং অভিজ্ঞ সেনাগণ।

তাদের মাধ্যমে তিনি মজলিসে শুরা গঠন করেছিলেন।

একই সময়ে তিনি ইউরােপ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে রাজত্ব বিস্তৃত করেছেন। ইউরােপে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীন এলাকায় উসমানি সৈন্যরা আক্রমণ করে।

৭৬২ হিজরি মােতাবেক ১৩৬০ খ্রিষ্টাব্দে তারা আদ্রিয়ানােপল দখল করে। বলকান অঞ্চলের জন্য এ শহরটি কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কুসতানতিনিয়ার পর সেটি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর।

৭৬৮ সাল থেকে এ শহরটিকেই সুলতান মুরাদ উসমানি সাম্রাজ্যের রাজধানী বানিয়ে নেন। এর ফলে রাজধানী ইউরােপে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। আদ্রিয়ানােপল হয়ে যায় মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী।

এই রাজধানী স্থানান্তরের দ্বারা সুলতান মুরাদের উদ্দেশ্যগুলাে ছিল-

১/যুদ্ধকবলিত আদ্রিয়ানােপলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং অন্যান্য যুদ্ধের সম্ভাব্য অঞ্চলের সাথে তার নৈকট্য।

২/ইউরােপীয় অঞ্চল অধিকরণে সুলতান মুরাদের আগ্রহ। যে এলাকায় তাদের জিহাদের দামামা পৌঁছে গিয়েছিল এবং তাদের পায়ের তলের মাটি শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

৩/এই রাজধানীতে সুলতান মুরাদ সাম্রাজ্য শক্তিশালীকরণের সকল উপাদান এবং প্রশাসনিক নিয়মনীতি একত্র করেছিলেন। ফলে এখানে রাজকর্মচারী, সেনাবাহিনী, আইনবিশেষজ্ঞগণ এবং ধর্মীয় আলেমগণ স্থির হয়ে যান। এখানেই শাসকদের প্রাসাদসমূহ স্থাপন করা হয়। শহরের মাদরাসাগুলােকে সংস্কার করা হয় এবং সৈন্যদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।

আদ্রিয়ানােপলের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সভ্যতা-শিষ্টাচার এবং ধর্মীয় অবস্থা এভাবেই অক্ষত ছিল। এরই মাঝে ৮৫৭ হিজরি মােতাবেক ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে উসমানিরা কনস্টান্টিনােপল বিজয়ে সক্ষম হয়। তখন কনস্টান্টিনােপল তাদের সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত হয়।

""সুলতান মুরাদের সময়ের উল্লেখযােগ্য কর্মকাণ্ড""

_মুরাদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের মিত্রতা_

সুলতান মুরাদ ইউরােপে তার জিহাদ, দাওয়াত এবং বিজয়ের মিশন অব্যাহত রেখেছিলেন। তার সেনাবাহিনী মাকদুনিয়া বিজয় করে ফেলে। এর প্রতিশােধ নেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন থেকে চক্রান্ত হচ্ছিল। ফলে ইউরােপ এবং বলকানের ক্রুসেডাররা তার বিরুদ্ধে একত্র হয়। তারা বুলগেরিয়া, সার্বিয়া এবং হাঙ্গেরির ক্রুসেডারদেরকেও নিজেদের সঙ্গে নিয়ে নেয়। তাদের এই মিত্রতার সময়ে উসমানিরা তাদের সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত হতে ৬০হাজারের একটি সৈন্যবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়। যাদের নেতৃত্বে ছিল ‘লালা শাহিন' নামে একজন সেনাপতি। মিত্রশক্তির তুলনায় তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল কম। মারতিজা নদীর তীরে তাসিরমিন নামক এলাকার নিকটে তাদের মুখােমুখি সংঘর্ষ হয়। সেখানে মারুয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে মিত্রপক্ষের সৈন্যরা পরাজিত হয়। সার্বিয়ার দুই সেনাপতি পলায়ন করে; কিন্তু মারতিজা নদীর গভীরে তাদের সলীল সমাধি হয়। হাঙ্গেরীয়ান সেনাপতি আশ্চর্যজনকভাবে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। এ সময়ে সুলতান মুরাদ মধ্য এশিয়ায় যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। সেখানে তিনি বেশ কয়েকটি শহর জয় করেন। তারপর তিনি বিজিত শহর এবং অঞ্চলসমূহে শৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থা তৈরির জন্য তার সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীতে ফিরে আসেন। এমনটিই একজন বিচক্ষণ শাসকের গুণ।।

মারতিজা নদীর তীরে উসমানিদের বিজয়লাভের উল্লেখযােগ্য ফলাফলসমূহ:

১/এই বিজয়ের মাধ্যমে তােরাকিয়া এবং মাকদুনিয়া সম্পূর্ণরূপে তাদের অধীন হয়ে যায়। তাদের রাজত্বের সীমানা পৌঁছে যায় বুলগেরিয়ার উত্তরপ্রান্ত এবং সার্বিয়ার পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত।

২/শীতকালে গাছ থেকে পাতা যেমন ঝরে পড়ে, বাইজানটাইন, বুলগেরিয়া, সার্বিয়ার এলাকাগুলো সেভাবে ক্রমাগত মুসলমানদের করতলে আসতে থাকে।

উসমানী সাম্রাজ্য এবং খ্রিষ্টানদের ___মাঝে প্রথম সন্ধি চুক্তি___
উসমানি সাম্রাজ্যের বাহু যখন প্রবল শক্তিশালী হয়ে গেল, তখন তার আশপাশের এলাকার শাসকরা ভীত হয়ে পড়ল। বিশেষ করে তাদের মধ্য হতে যারা শক্তিমত্তার দিক দিয়ে দুর্বল তারা। তাই রাজুজা রাষ্ট্র এগিয়ে আসে। তারা সুলতান মুরাদ এর কাছে প্রেরণ করেন, যেন তিনি তাদের সাথে ব্যবসায়িক এবং সম্প্রতি চুক্তি করেন। তারা বাৎসরিক ৫০০ দোকা স্বর্ণের বিনিময়ে সন্ধি চুক্তি করেন।
উসমানি সাম্রাজ্যের এবং খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের মাঝে এটি ছিল প্রথম কোন সন্ধি চুক্তি।


................উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাস............... ____পর্ব:১০_____ """"__কসোভোর যুদ্ধ__""""


সুলতান মুরাদ বলকান অঞ্চল অধিকৃত করার প্রতি নিজ ইচ্ছা থেকেই অধিক। মনােযােগী ছিলেন। তার সেনাপতিদেরও একই অভিপ্রায় ছিল, যা সার্বীয়দের উত্তেজিত। কসােভাের যুদ্ধ করেছিল। তাই তারা সুলতানের অনুপস্থিতির সুযােগ নিয়ে একাধিকবার বলকান এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উসমানি সৈন্যদের ওপর আক্রমণের দুঃসাহস করে; কিন্তু উসমানিদের ওপরে আল্লাহর সাহায্য আছে বলে একটি কথা আছে। এ কথার বাস্তব প্রতিফলনের ফলে তারা বারবার ব্যর্থ হয়। তাই সার্বিয়া, বসনিয়া, বুলগেরিয়ানরা সুলতান মুরাদের ওপর আক্রমণের জন্য একটি শক্তিশালী ইউরােপীয় ক্রুসেডার বাহিনী গঠন করে। এ দিকে সুলতান একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করে বলকানের কুসুফা এলাকা পর্যন্ত বিজয় করে ফেলেছিলেন।

এ যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত একটি ঘটনার উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়। সুলতান মুরাদের উজির, যিনি সবসময় তার সাথে কুরআন নিয়ে ঘুরতেন, তিনি একবার অনিচ্ছাকৃতভাবেই কুরআন খুলেন। তখন তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় কুরআনের এই আয়াতের ওপর--

"يايها النبي حرض المؤمنين على القتال ان يكن منكم عشرون صابرون يغلبوا مائتين وان يكن منكم مائة يغلبوا الفا من الذين كفروا بانهم قوم لا يفقهون"

‘হে নবি, আপনি মুমিনগণকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করুন। আপনাদের যদি ২০ জন ধৈর্যশীল সৈন্যও হয়, তাহলে তারা ২০০ জনকে পরাজিত করবে। আর যদি সৈন্যসংখ্যা ১০০ হয়, তাহলে তারা ১হাজার কাফেরকে পরাজিত করবে। কেননা, তারা নির্বোধ জাতি।' [সুরা আনফাল, আয়াত : ৬৫]

তিনি এই আয়াত থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করেন। অন্যান্য মুসলিমরাও তার সাথে সুসংবাদ গ্রহণ করেন। এই ঘটনার স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই দুই দলের মাঝে লড়াই শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে, লড়াই জমে যায়। শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের নিরঙ্কুশ বিজয়লাভের মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

""""""_সুলতান মুরাদের শাহাদাতবরণ_"""""

কসােভাের যুদ্ধ শেষে সুলতান মুরাদ যুদ্ধপ্রান্তে নিহত মুসলিমদের কাতারে হেঁটে হেঁটে খোঁজ নিচ্ছিলেন এবং তাদের জন্য দোয়া করছিলেন। এভাবে তিনি আহতদেরও খোঁজ নিতেন। এ সময় এক সার্বীয় সৈন্য হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। সে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি ছিল। সে সুলতানের দিকে ছুটতে শুরু করলে প্রহরীরা তাকে ধরে ফেলে; কিন্তু সে সুলতানের সাথে দেখা করার এবং ইসলাম গ্রহণ করার অভিলাষ ব্যক্ত করে। ফলে সুলতান প্রহরীদেরকে তাকে ছেড়ে দিতে বলেন।

একপর্যায়ে সে সুলতানের হাতে চুমাে দিতে চায়। এরপর সুযােগ বুঝে দ্রুততার সাথে বিষাক্ত খঞ্জর বের করে সুলতানকে আঘাত করে। এ আঘাতে ৭৯১ হিজরির ১৫ শাবান সুলতান মুরাদ (রাহিমাহুল্লাহু তাআলা) শাহাদাতলাভ করেন।

"""""__সুলতান মুরাদের শেষ কথাগুলাে__"""""

আমার চূড়ান্ত যাত্রার সময়ে আমি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করছি। তিনি অদৃশ্যের সংবাদ জানেন। অভাবীর দোয়া কবুল করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনাে ইলাহ নেই। শােকর এবং প্রশংসার উপযুক্ত একমাত্র তিনিই। আমি আমার জীবনের শেষপ্রান্তে উপনীত হয়েছি। আমি ইসলামের সৈন্যদলের সাহায্য প্রত্যক্ষ করেছি। তােমরা আমার ছেলে বায়েজিদকে অনুসরণ করবে। বন্দিদেরকে কষ্ট ও শাস্তি দেবেনা। তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেবেনা। এই সময় থেকে আমি তােমাদের এবং আমাদের বিরাট বিজয়ী সৈন্যদলকে আল্লাহর রহমতের ছায়ায় সােপর্দ করে যাচ্ছি। তিনিই আমাদের সাম্রাজ্যকে সকল অনিষ্ট থেকে হেফাজত করবেন।

এই মহান সুলতান ৬৫বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন..

"সুলতান মুরাদ প্রকৃত ঈমানের জীবনযাপান করেছিলেন"
সুলতান মুরাদ প্রায় ৩০ বছর অত্যন্ত বিচক্ষণতা এবং দক্ষতার সাথে উসমানি সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সমসাময়িক কেউ প্রতিবন্ধক হতে পারেনি।

"বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ হাল্কু নিদিলাস"
প্রথম মুরাদ সম্পর্কে বলেন, 'মুরাদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। আনাতোলিয়া এবং বালকান ছাড়াও মোট ৩৭ টি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সবগুলো থেকে বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন। তিনি তার সকল প্রজার সাথে কোমল ব্যবহার করতেন। এক্ষেত্রে রক্ত এবং ধর্মের পার্থক্যের বিবেচনা করতেননা'

"ফরাসি ইতিহাসবিদ ক্ৰিনার্ড" তার সম্পর্কে বলেন, ‘মুরাদ ছিলেন উসমানি সাম্রাজ্যের উল্লেখযােগ্য ব্যক্তিত্বগণের একজন। ব্যক্তিত্বের মাপকাঠিতে দাঁড় করালে তিনি তার সময়ের সকল ইউরােপীয় শাসকদের শীর্ষে থাকবেন

সুলতান প্রথম মুরাদ পিতার কাছ থেকে এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন, যা তার পিতার ইনতেকালের সময় ৯৫০০০ বর্গ কিলােমিটারে গিয়ে পৌঁছেছিল। তিনি তার ছেলেকে যখন সাম্রাজ্য অর্পণ করেন তখন তা গিয়ে পৌঁছেছিল ৫লক্ষ বর্গ কিলােমিটারে। মােটকথা, তিনি তার ২৯ বছরের রাজত্বকালে পিতা উরখানের কাছ থেকে উত্তরাধিকার প্রাপ্ত রাজত্বের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি রাজত্ব বিস্তৃত করেছিলেন।

কসােভাের যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের ফলে যে উপকার হয়েছিল তা নিম্নরূপ-
১/বলকান অঞ্চলে ইসলামের প্রসার এবং বহুসংখ্যক প্রবীণ এবং বয়স্ক লােকদের স্বেচ্ছায় ইসলামগ্রহণ।

২/এ যুদ্ধের ফলে অনেক ইউরােপীয় সাম্রাজ্য উসমানিদের সাথে সম্প্রীতি ঘােষণা করতে বাধ্য হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে কেউ জিজিয়া দিয়েছে। আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে উসমানিদের আনুগত্য ঘােষণা করেছে, যাতে উসমানিদের রােষানলে পড়তে না হয়।

৩/এ যুদ্ধের মাধ্যমে উসমানি সালতানাতের আধিপত্য বিস্তৃত হয় হাঙ্গেরি, রােমানিয়া এবং তাদের পার্শ্ববর্তী ইদরিয়াতিকের তীরবর্তী অঞ্চলগুলােতে। এমনকি আলবেনিয়া পর্যন্ত তাদের কর্তৃত্ব প্রসারিত হয়।

"সামনে আসছে সুলতান প্রথম বায়েজিদ এবং সে সাম্রাজ্যের যে হাল করে ছেড়ে ছিল!"

--এর মাধ্যমে আমরা প্রথম সিজন শেষ করলাম!
এই সিজনে,
আমরা আরতুগ্রুল-গাজী, সুলতান উসমান-গাজী, সুলতান উরখান, সুলতান প্রথম মুরাদ!
এই চার বীর পুরুষের জীবনী এবং কার্যক্রমগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছি, আলহামদুলিল্লাহ!

--সুলতান প্রথম বায়েজিদ থেকে আমরা দ্বিতীয় সিজন শুরু করব, ইনশাআল্লাহ!

--প্রথম সিজনের লিংক:
----https://m.facebook.com/groups/AzmiKafela/permalink/1852630591555142/

•••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••[][][]

[]__পর্ব:১১________Π________

"সুলতান প্ৰথম বায়েজিদ" [৭৯১-৮০৫হিজরি/১৩৮৯-১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দ]-------

সুলতান মুরাদের শাহাদাতের পর তার ছেলে বায়েজিদ শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন বীর, সম্মানিত ও প্রেমময় ব্যক্তিত্ব।

ইসলামি বিজয়যাত্রার প্রতি তার উদ্দীপনা ছিল প্রবল। তাই তিনি সামরিক বিষয়ে ব্যাপক গুরুত্ব দান করেন। তিনি আনাজুলের খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যকে তার লক্ষ্য বানিয়েছিলেন। এক বছরের মাঝেই তারা উসমানি সাম্রাজ্যের অনুগত হয়ে যায়।

বলকান এবং আনাজুলের এই দুই প্রান্তে বায়েজিদ বিজলির গতিতে তার অভিযানসমূহ পরিচালনা করেছেন। তাই তাকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল ‘الصاعقة' অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়।

সুলতান বায়েজিদের কার্যক্রমসমূহ:"

__এক/সার্বিয়ার সাথে তার রাজনৈতিক সম্পর্ক__

"উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বলকানে যে মিত্রশক্তি তৈরি হয়েছিল সেখানে সার্বিয়ানদেরও ভূমিকা ছিল; কিন্তু তা সত্ত্বেও সুলতান বায়েজিদ তাদের সাথে সম্প্রীতিপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা করেন। এর মাধ্যমে সুলতান বায়েজিদের উদ্দেশ্য ছিল, উসমানি সাম্রাজ্য এবং হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের মাঝে সার্বিয়া সাম্রাজ্যকে প্রতিবন্ধকরূপে গ্রহণ করা। তিনি তার সামরিকব্যবস্থায় একটি মিত্রশক্তির প্রয়ােজনবােধ করছিলেন, যেমনটি মধ্য এশিয়ায় তুর্কি ইসলামি সেলজুক সালতানাত করেছিল। তাই সুলতান বায়েজিদ কসােভাের যুদ্ধে নিহত সার্বিয়ার রাজা লাজারের দুই ছেলেকে সার্বিয়ার শাসক নিযুক্তকরণে সম্মত হন এবং তাদেরকে সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন, ধর্মমত অনুযায়ী শাসন করতে বলেন।

বিনিময়ে তারা সুলতান বায়েজিদের অনুগত হবে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে জিজিয়া প্রদান করবে। আর সুলতানের বিভিন্ন যুদ্ধে তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য অংশগ্রহণ করবে। এ সময় সুলতান বায়েজিদ লাজার মেয়েকে বিয়ে করেন।

_দুই/উসমানি নেতৃত্বের সামনে বুলগেরিয়ার অবনত_

হওয়া সার্বিয়ার সাথে বােঝাপড়া শেষে বায়েজিদ ৭৯৭ হিজরি মােতাবেক ১৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বুলগেরিয়ার দিকে মনােনিবেশ করেন। তাদের ওপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার অধিবাসীদের মাথা অবনত করে দেন। ফলে বুলগেরিয়া তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। উসমানি সাম্রাজ্যের হাতে বুলগেরিয়ার পতনের মাধ্যমে ইউরােপ অঞ্চল নড়েচড়ে বসে। ইউরােপের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ে উসমানি সাম্রাজ্যের ভয়ভীতি। বলকান অঞ্চলে উসমানিদের ওপর হামলা করার জন্য খ্রিষ্টান পরাশক্তি আবার পরিকল্পনা শুরু করে।

"""____তিন/উসমানি সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্রুসেডীয় খ্রিষ্টান সাম্রাজগুলাের এক হওয়া____"""

হাঙ্গেরির রাজা সিজাসমুন্ড এবং পােপ নবম বুনিফাস উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্রুসেডীয় খ্রিষ্টান রাজ্যগুলােকে এক হওয়ার আহ্বান জানান। চতুর্দশ শতাব্দীতে উসমানি সাম্রাজ্য যেসব আক্রমণের মুখােমুখি হয়েছিল তার মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বড়। এতে বিপুলসংখ্যক রাজ্য অংশগ্রহণ করেছিল। পাশাপাশি তারা অস্ত্র, সৈন্যসামন্ত, এবং ধন- সম্পদের মাধ্যমে সমান ভাগ দিয়ে ভূমিকা রেখেছিল। এ যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের সামগ্রিক সৈন্যসংখ্যা পৌঁছে যায় ১ লক্ষ ২০ হাজারে, যাতে ছিল আলমেনিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, উত্তরের নিচু ভূমি এবং ইতালীয় কতক সাম্রাজ্যের সৈন্যরা।

৮০০ হিজরি মােতাবেক ১৩৯৭ খ্রিষ্টাব্দে হাঙ্গেরিতে হামলার পরিকল্পনা শুরু হয়; কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই তাদের নেতা ও সেনাপতিরা সিজাসমুন্ডের সাথে মতানৈক্যে লিপ্ত হয়। সিজাসমুন্ড প্রথমে উসমানিদের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন; কিন্তু তাদের সেনাপতিরা প্রথমে হামলা শুরু করে। তারা দানিয়ুব নদীর পাশে হামলায় অবতীর্ণ হয়ে বলকানের দক্ষিণে নিকোবােলিসে গিয়ে অবরােধ করে।

•••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

__Π________পর্ব:১২________Π_____

আর প্রথম ধাক্কাতেই উসমানি সাম্রাজ্যের কাছে পরাজিত হয়। হঠাৎ করেই সুলতান বায়েজিদ তার সাথে একহাজার সৈন্য নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হন। আর এতেই যুদ্ধের মােড় ঘুরে যায়। যদিও খ্রিষ্টানদের অনুপাতে তারা অনেক কম; কিন্তু অস্ত্রে এবং মনােবলে ছিল তাদের চেয়ে উর্ধ্বে। তারা অধিকাংশ খ্রিষ্টানকেই ভূপতিত করে। তারা পলায়নের পথ ধরতে বাধ্য হয়। তাদের উল্লেখযােগ্য সংখ্যক নেতাদের হত্যা এবং বন্দি করা হয়।

উসমানি সাম্রাজ্য নিকোবােলিস যুদ্ধ থেকে বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভ করে এবং শত্রুদের ঘাঁটির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে। বিজয় এবং সাহায্যের রমরমা অবস্থা দেখে সুলতান বায়েজিদ বলেন, নিশ্চয় অচিরেই ইতালি বিজয় হবে। আর রােমের সাধু পিতরের সমাধিস্থলে তার ঘােড়া যব ভক্ষণ করবে।”

ফ্রান্সের অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বন্দি হন। তাদের মধ্যে কাউন্ট ডি নিফার অন্যতম। সুলতান বায়েজিদ ফিদয়া গ্রহণ করে সকল বন্দি এবং কাউন্ট ডি নিফারকে মুক্তি দেন।

সে শপথ করেছিল, সে কখনাে আর উসমানিদের সাথে পুনরায় যুদ্ধ করবে না। তাই সুলতান বায়েজিদ তাকে বলেছিলেন, তােমার এই শপথ অব্যাহত না রাখার অনুমতি দিচ্ছি তােমাকে, তুমি চাইলে আমার সাথে যুদ্ধ করতে পার। কারণ, আমার কাছে সমস্ত ইউরােপীয় খ্রিষ্টানদের সাথে লড়াই করা এবং তাদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করার চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই।

হাঙ্গেরির রাজা সিজাসমুন্ড, যে তার ক্ষমতা এবং সামরিক শক্তির কারণে গর্বের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল সে বলেছিল, আকাশ যদি তার একেবারে উচ্চতায় পৌঁছে যায় তাহলে আমরা তাকে আমাদের বর্মগুলাে দ্বারা আটকে রাখতে পারব। সে উধর্বশ্বাসে পালিয়ে যায়। তার সাথে ছিল ফ্রান্সের সেনাপতি রােডস। যখন তারা পালাতে পালাতে কৃষ্ণ সাগরের তীরে গিয়ে পৌঁছায় সেখানে খ্রিষ্টানদের নৌবহর দেখতে পায়। তারা দ্রুতবেগে পেছনে না তাকিয়েই সেখানকার একটি জাহাজে করে পালিয়ে যায়। নিকোবোলিসের যুদ্ধের পর ইউরােপীয়দের চোখে হাঙ্গেরিদের মর্যাদার অবস্থান খর্ব হয়। তাদের যে অবস্থান এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল তা উধাও হয়ে যায়। সে যুদ্ধে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে বিরাট সাহায্য অবতীর্ণ হয়েছিল তার প্রভাব সুলতান বায়েজিদ এবং ইসলামি সমাজের ওপর পড়েছিল। তাই সুলতান বায়েজিদ প্রাচ্যের ইসলামি সাম্রাজ্যগুলাের বড় বড় শাসকদের কাছে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে এই বিরাট সাহায্যের খবর পত্র মারফতে পাঠিয়ে দেন।

দূতরা তাদের সাথে খ্রিষ্টানবন্দিদেরকে দূরদূরান্তের মুসলিম শাসকদের জন্য উপহারস্বরূপ এবং সাহায্যের প্রমাণস্বরূপ নিয়ে যায়। সুলতান বায়েজিদ সেলজুক সালতানাতের ওপরে তার উত্তরাধিকারীদের দলিলস্বরূপ এবং আনাজুলের সকল প্রান্তে তার কর্তৃত্ব পৌঁছানাের জন্য ‘সুলতানে রােম’ উপাধি ধারণ করেন। তিনি কায়রাের আব্বাসীয় খলিফার কাছে দূত প্রেরণ করে তার এই উপাধির স্বীকৃতি দিতে বলেছিলেন, যাতে তিনি এর মাধ্যমে তার এবং তার পূর্বপুরুষদের রাজত্বের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলােতে সুলতান বায়েজিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপরে বিধানগত এবং প্রথাগতভাবে সমর্থন করেন। এ সময় আব্বাসীয় খলিফার সম্মতির সাথে একমত হন মামলুক সুলতান বারকুক। কারণ, তিনি তৈমুর লংয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানাের জন্য একমাত্র সুলতান বায়েজিদকেই যােগ্য মনে করতেন।

তখন তৈমুর লং মামলুক এবং উসমানিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উসমানি সাম্রাজ্যের খেদমত করার জন্য আনাজুলে হাজার হাজার মুসলিম হিজরত করে। হিজরতকারীরা সৈন্য দ্বারা ভরপুর ছিল। আরও ছিল এমন কিছু লােক যারা ইরাক, ইরান এবং মা-ওরা-উন্নাহার অঞ্চলের অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অবদান রেখেছিল। মধ্য এশিয়ায় তৈমুর লং এর আক্রমণের সম্মুখস্থল থেকে তারা কোনাে মতে পালিয়ে এসেছিল।

•••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

___Π________পর্ব:১৩________Π____

সুলতান বায়েজিদ এর কার্যক্রমে ৪ নম্বরটি হচ্ছে;

"""""_____চার/কনস্টান্টিনোপল অবরোধ____"""""

নিকোবােলিস যুদ্ধের আগে সুলতান বায়েজিদ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ওপর চাপ প্রয়ােগে সক্ষম হয়েছিলেন এবং কনস্টান্টিনােপলে বসবাসকারী মুসলিমদের মাঝে বিচারকার্যের জন্য একজন মুসলিম কাজি নিয়ােগে বাধ্য করেছিলেন। এর কিছুদিন যেতে-না-যেতেই তিনি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী অবরােধ করেন। ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য একটি মুসলিম বিচারসভা, মসজিদ নির্মাণ এবং সেখানকার মুসলিম অধিবাসীদের জন্য শহরের ভিতরে ৭০০টি গৃহ নির্মাণে সম্মত হন। সেখানে প্রায় ৬০০০ উসমানি সৈন্য মােতায়েনের মাধ্যমে এভাবে সুলতান বায়েজিদ তাদের ওপর কর্তৃত্ব অর্ধেকে নামিয়ে ফেলেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ওপর আরােপিত জিজিয়ার পরিমাণ বাড়ানাে হয় এবং শহরের বাইরের আঙুর বাগান ও অন্যান্য ফসলের ওপর উসমানি সাম্রাজ্যের কোষাগার নিয়ম জারি করে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানীতে মুআজ্জিনের আজান চালু হয়। নিকোবােলিসের যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয়লাভের পর বলকান অঞ্চলে মুসলিমদের পায়ের তলের মাটি শক্ত হয়। বলকান অঞ্চলের গােত্রগুলাের মাঝে উসমানি সাম্রাজ্যের ভীতি এবং প্রভাব হয়ে পড়ে। বসনিয়া, বুলগেরিয়া উসমানি সাম্রাজ্যের সামনে মাথানত করে। উসমানি সৈন্যরা খ্রিষ্টানদের বাকি অমুসলিমসুলভ কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া অব্যাহত রাখে। সুলতান বায়েজিদ মাওরা উপদ্বীপের শাসকদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন; যারা ক্রুসেডীয় মিত্রশক্তিকে সামরিক সাহায্য করেছিল। তিনি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজার ওপরেও শাস্তি আরােপ করেন। কারণ, সুলতান বায়েজিদ তাকে কুসতানতিনিয়া হস্তান্তর করতে বলায় সে এর বিরুদ্ধাচরণ করে। এর বিপরীতে বাইজেন্টাইন শাসক ম্যানুয়েল ইউরােপীয়দের থেকে কোনাে সাহায্য পেলেন । মূলত কুসতানতিনিয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তার করা সুলতান বায়েজিদের জিহাদি কার্যক্রমের প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল। এ জন্য তিনি সৈন্যদল নিয়ে বাইজেন্টাইন রাজধানীর ওপর জোরদার অবরােধ স্থাপন করেন এবং তিনি অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়ােগ করতে থাকেন। এমনকি শহর প্রায় পতনের কাছাকাছি চলে এসেছিল। একদিন অথবা তার পরদিনের মাথায় ইউরােপ তাদের শক্তিশালী রাজধানীর পতনের অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখনই সুলতান বায়েজিদ তার সাম্রাজ্যে নতুন কিছু সমস্যার ফলে কনস্টান্টিনােপল বিজয় অভিযান থেকে ফিরে আসেন।

""""____পাঁচ/তৈমুর লং এবং বায়েজিদের মধ্যকার সংঘর্ষ""""____

তৈমুর লং মা-ওরা-উন্নাহার অঞ্চলের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি খােরাসান এবং সমরকন্দের সিংহাসনে বসেন। তিনি তার দক্ষ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ইসলামি সাম্রাজ্যের বিশাল একটি অংশে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হন। এশিয়ায় দিল্লি থেকে নিয়ে দামেশক পর্যন্ত, আরাল সাগর থেকে নিয়ে আরব উপসাগর পর্যন্ত, তার এই পরাশক্তির কথা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি পারস্য, আর্মেনিয়া, দজলা ও ফোরাতের উৰ্বাঞ্চল, এবং কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মধ্যবর্তী এলাকাগুলােকে টার্গেট করেন। আর রাশিয়ায় ভলগা, ডন এবং ড্যানিভার নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেন। তিনি ঘােষণা দেন, তিনি অচিরেই এ অঞ্চলের মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবেন এবং এগুলােকে তার রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করবেন। তিনি বারবার একটি কথা আওড়াতেন, (আকাশে যত দিন একজন প্রভু থাকবেন তত দিন জমিনের অধিপতিও একজন হওয়া আবশ্যক) তৈমুর লং ছিলেন একজন বীর, যুদ্ধ প্রতিভাবান এবং রাজনৈতিক দক্ষ ব্যক্তিত্ব। তিনি কোনাে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পূর্বে অনেক তথ্য তালাশ করতেন এবং গােয়েন্দা প্রেরণ করতেন। তারপর ধীরেসুস্থে এবং খুব ভেবেচিন্তে কোনাে রকম তড়িঘড়ি না করে সিদ্ধান্ত দিতেন।

••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

___Π________পর্ব:১৪________Π__

তার এমন প্রভাব ছিল যে, তার সৈন্যরা যেখানেই থাকত সেখানেই তার আদেশের অনুসরণ করত। একজন মুসলিম হিসেবে তৈমুর লং আলেম-উলামা এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণের মর্যাদার প্রতি লক্ষ রাখতেন। বিশেষভাবে যারা নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী ছিলেন তাদের সম্মান করতেন।

তৈমুর লং এবং সুলতান বায়েজিদের মাঝে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে যে সমস্ত কারণ ছিল তা হলো-

১/ইরাকের শাসকগণের বায়েজিদের কাছে আশ্রয় চাওয়া। যে ইরাক অঞ্চলে তৈমুর লং আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। এভাবে এশিয়া মাইনরের কিছু নেতৃবৃন্দ তৈমুর লং এর কাছে আশ্রয় চেয়েছিল। উভয়পক্ষেই আশ্রয়প্রার্থীরা তাদের আশ্রয়দাতাদের অপর পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল।

২/খ্রিষ্টান কর্তৃক তৈমুর লংকে বায়েজিদের ওপর আক্রমণের জন্য প্রলুদ্ধ করা।

৩/ দুই পক্ষের মধ্যে উষ্ণ চিঠির আদানপ্রদান। তৈমুর কর্তৃক প্রেরিত চিঠিতে তৈমুর বায়েজিদকে অপমান করেন। তিনি বায়েজিদকে তার পরিবারের মূলের দিকে অস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে অপমানের চেষ্টা করেন। উসমানি সালতানাত ইসলামের জন্য বিরাট ভূমিকা রেখেছে, এ দিকে লক্ষ করে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলেন। চিঠির শেষে বায়েজিদকে শুধু তুরস্কের শাসক উল্লেখ করে তৈমুর লং তাকে তুচ্ছ করেন। বায়েজিদ তৈমুর লং-এর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বলেন, তিনি অবশ্যই তিবরিজ এবং তার সালতানাতের দিকে তৈমুর লং-এর গতিবিধির প্রতি লক্ষ রাখবেন। তৈমুর লং এবং বায়েজিদ উভয়েই তাদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট ছিলেন।

ছয়. উসমানি সাম্রাজ্যের বিভক্তি

তৈমুর লং তার সেনাবাহিনী নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হন এবং সিওয়াস অঞ্চলকে টার্গেট করেন। সেখানকার প্রশাসক ছিলেন বায়েজিদের ছেলে আরতুগ্রুল। উভয়পক্ষ ৮০৪ হিজরি মােতাবেক ১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দে আঙ্কারার নিকটে মুখােমুখি হয়। এ সময় বিরােধীদের মােকাবেলায় বায়েজিদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার। তৈমুর লং ১৪ ০৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেন। এ যুদ্ধে মঙ্গোলীয়রা বিজয়ী হয়। যুদ্ধে বায়েজিদের পরাজয় ঘটেছিল তার তাড়াহুড়া এবং আগ-বেড়ে আক্রমণ করার কারণে।

তিনি ও তার সৈন্যদল যেখানে অবস্থান করেছিলেন সে জায়গাটা উপযােগী ছিল না। যেখানে তার সৈন্যসংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ছিল না, সেখানে বিরােধীদের সৈন্যও ৮০ হাজারের চেয়ে কম ছিল না। বায়েজিদের বহু সৈন্য পানির অভাবে মারা যায়। তখন গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া ছিল। আঙ্কারায় দু পক্ষের মাঝে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বায়েজিদের সৈন্যদলে যে সমস্ত তাতারি সৈন্যরা ছিল তারা পলায়ন করে।

এ ছাড়া সুলতান বায়েজিদ নিকটবর্তী সময়ে এশিয়া মাইনরের যে সকল এলাকা বিজয় করেন সেখানকার সৈন্যরাও পালিয়ে যায়। তারা গিয়ে তৈমুর লং- এর সৈন্যদলের সাথে মিলিত হয়। এরপর উসমানি সুলতান এবং তার সেনাবাহিনী যুদ্ধের ময়দানে পূর্বেকার বীরত্ব এবং মরিয়া হয়ে লড়াই করার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেননি।

পশ্চিমা খ্রিষ্টান সাম্রাজ্য তৈমুর লং এর এই বিজয়ে আনন্দিত হয়। সুলতান বায়েজিদের পতন এবং তার রাজত্বের বিভক্তিতে তারা আনন্দ প্রকাশ শুরু করে। তারা তৈমুর লং- কে এই বিজয়ের জন্য শুভেচ্ছা এবং অভিবাদন জানাতে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং কাস্টাইলের রাজাকে প্রেরণ করে। ইউরােপীয়রা বিশ্বাস করে নেয় তারা এখন উসমানি সাম্রাজ্যের কবল থেকে মুক্ত, যারা দীর্ঘদিন তাদেরকে ভুগিয়েছে এবং হুমকির মুখে রেখেছে। সুলতান বায়েজিদের এ পরাজয়ের পর তৈমুর লং আজনিক, বারুসা প্রভৃতি শহর জয় করেন। এরপর তিনি ইজমিরের সীমান্তকে চূর্ণবিচূর্ণ করে এই শহরকে সেনাপতি রুডসের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করেন। এর মাধ্যমে তিনি উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার কারণে অন্যান্য ইসলামি সাম্রাজ্য দ্বারা যে সমালােচনার শিকার হয়েছিলেন তা থেকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেন।

সেন্ট ইয়ুহনাকে হত্যা করার মাধ্যমে তৈমুর লং আনাতােলিয়া অঞ্চলে তার হামলাগুলাের ওপরে জিহাদের মােড়ক লাগানাের চেষ্টা করেন। সুলতান বায়েজিদ বন্দি হন এবং এর পরের বছরেই মত তাকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে। এভাবেই তৈমুর লং এশিয়া মাইনরের শাসকদেরকে তাদের রাজত্ব ফিরিয়ে দেন। এরপর বায়েজিদ যে এলাকাগুলাে অধীন করেছিলেন সেগুলাে স্বাধীন রাজ্য হওয়ার কারণে ফিরিয়ে দিতে চান। এভাবে তৈমুর বায়েজিদের সিংহাসন নিয়ে লড়াইয়ে মত্ত ছেলেদের মাঝে বিভক্তির বীজ রােপণ করে দেন।

••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

___Π________পর্ব:১৫________Π_____

____সাত/অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ """"____

বায়েজিদের সন্তানদের মাঝে সিংহাসন নিয়ে অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের কারণে উসমানি সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাদের মধ্যকার এই লড়াই ৮০৬ থেকে ৮১৬ হিজরি মােতাবেক ১৪০৩ থেকে ১৪১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তথা দশ বছর অব্যাহত থাকে।

বায়েজিদের পাঁচ সন্তান ছিল, যারা তার সাথে তৈমুর লং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্য হতে একজন মুস্তফা। তার ব্যাপারে ধারণা করা হয়, তিনি যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

মুসা তার পিতার সাথে বন্দি হয় এবং অপর তিনজন পালাতে সক্ষম হয়। তাদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ সুলাইমান আদ্রিয়ানােপল চলে যায়। নিজেকে সেখানকার সুলতান ঘােষণা করে।

ইসা চলে যায় বারুসা অঞ্চলে এবং নিজেকে সেখানকার সুলতান ঘােষণা করে। এভাবেই তাদের তিন ভাইয়ের মাঝে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। তারা রাজত্বের ভগ্ন দেহ নিয়ে ঝগড়া শুরু করে। আর শত্রুরা চতুর্দিক থেকে তাদের প্রতি রক্তক্ষয়ীদৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকে। এরপর তৈমুর লং মুসাকে মুক্তি দেয়।

তার মাধ্যমে ফিতনার আগুন আরও উর্ধ্বমুখী করে দেওয়ার জন্য এবং তাদের হিংস্রতা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সে তাদেরকে লড়াইয়ে এবং পরস্পরের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টিতে ইন্ধন দিতে থাকে। এক বছর পর তৈমুর লং তার সেনাবাহিনী নিয়ে প্রস্থান করে। আর উসমানি রাজত্বকে রেখে যায় দুর্যোগ, ধ্বংস এবং বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থায়।

উসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এ অধ্যায়টি ছিল বিপদের এবং পরীক্ষার। কনস্টান্টিনােপল বিজয়ের আগেই তাদের মতাে সাম্রাজ্যের কার্যকরী ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলার একটি অনিবার্য নিয়ম হলাে, তিনি কোনাে জাতিকে বিভিন্নভাবে নিরীক্ষা না করে, অগ্নিপরীক্ষায় না ফেলে ক্ষমতা প্রদান করেন না। এভাবেই তিনি নিকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টদের পৃথক করে থাকেন। এটা উম্মতে মুহাম্মদির ওপর অব্যাহত একটি নিয়ম, যার কখনাে ব্যতিক্রম ঘটেনি।

আল্লাহ তাআলা মুমিনগণ কে বিপদে ফেলে পরীক্ষা করতে চেয়েছেন, যাতে তাদের ঈমান পরিচ্ছন্ন হয়। এরপর এই জমিনে তাদের অধিপত্য বিস্তার হবে। বিভিন্ন জাতি, রাষ্ট্র, গােত্র এবং সমাজে পরীক্ষা নেওয়ার নিয়ম জারি থাকবে। তাই উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতি আল্লাহর পরীক্ষা নেওয়ার এই ধারা অব্যাহত ছিল।

উসমানিরা তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা নিয়ে যে ভােগান্তি ভােগ করেছিল সেখান থেকে ক্রমাগত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে উত্তরণের মাধ্যমে তারা অমর হয়ে থাকবে।

এ ধারাবাহিকতায় ১৪১৩ খ্রিষ্টাব্দে গিয়ে সুলতান প্রথম মুহাম্মদ একক ক্ষমতার মালিক হন। তিনি রাজত্বের ছুটে যাওয়া বিভিন্ন অঞ্চল একীভূত করতে সক্ষম হন। আঙ্কারার দুর্যোগ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে উসমানি সাম্রাজ্য ফিরে আসে তাদের ঐশী নীতিধারায়। ফলে উসমানিদের মধ্য হতে তৈরি হয়েছিল আকিদা-বিশ্বাস, চরিত্র-স্বভাব, এবং জিহাদের দিক দিয়ে উৎকৃষ্ট একটি জাতি। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে উসমানিরা তাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং উত্তম চরিত্র সংরক্ষণ করেছিল।

উরখান এবং তার ভাই আলাউদ্দিন যে বিরল যােগ্যতায় তাদের নতুন রাজত্ব গঠন করেছিলেন এবং আশ্চর্যজনক প্রশাসনিক কাঠামাে তৈরি করেছিলেন, পাশাপাশি উসমানিদের সন্তান এবং যুবকদের জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, এ সমস্ত কারণে উসমানিদের অন্তরে একটি পরিপূর্ণ সঞ্জীবনী শক্তি সৃষ্টি হয়। আঙ্কারার দুর্ঘটনার পরে এই সাম্রাজ্য নতুনভাবে তার ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে দাঁড়ায়। প্রতিক্ষিপ্ত হয়ে তার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয় জীবনের জল। শরিয়তের প্রাণসঞ্চার হয়। নতুন করে তাদের দৃঢ়তা এবং সংযমের কাহিনি চর্চা হতে থাকে তাদের শত্রু, মিত্র সবার মুখে মুখে।

•••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

Π_______পর্ব:১৬_______Π__

"""""সুলতান প্ৰথম মুহাম্মদ [৭৮১-৮২৪ হিজরি/ ১৩৬৯-১৪২১ খ্রিষ্টাব্দে]"""

সুলতান প্রথম মুহাম্মদ ৭৮১ হিজরি মােতাবেক ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বায়েজিদের মৃত্যুর পর তিনি উম্মাহর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

ইতিহাসে তিনি মুহাম্মদ জালবি নামে প্রসিদ্ধ।

তিনি ছিলেন মধ্যম গঠনাকৃতি, গােলাকৃতি চেহারার।

তার দুই ভ্রু ছিল মিলানাে। গায়ের চামড়া ছিল শুভ্র। গণ্ডদেশ ছিল লাল। প্রশস্ত বুক এবং সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন।

তিনি ছিলেন অত্যধিক উদ্যমী এবং কর্মচঞ্চল। লড়াই এবং শক্তিশালী তির ধনুকের সাহচর্যে থাকতেন। তার রাজত্বকালে তিনি ২৪টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

৪০টি জখমে আক্রান্ত হন।

মুহাম্মদ জালবি তার দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং বিচক্ষণতার মাধ্যমে উসমানি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ মিটাতে সক্ষম হন।

তিনি এক এক করে তার ভাইদের পরাজিত করে নিজের রাজত্বের পথ পরিষ্কার করেন এবং একক সম্রাট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তার আট বছরের রাজত্বকালকে সাম্রাজ্যের পুনর্গঠন এবং সাম্রাজ্যের ভিত মজবুতকরণে ব্যয় করেন।

কোনাে কোনাে ইতিহাসবিদ তাকে উসমানি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা আখ্যা দিয়ে থাকেন।

এই সুলতান থেকে যা যা অবদান পাওয়া যায় তা হলাে, তিনি সহনশীলতার সাথে যারা তার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধাচরণ করেছে তাদেরকে শাসন করেছেন। কিরমানের শাসক যখন উসমানি সাম্রাজ্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল তখন তিনি তাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে পরবর্তী সময়ে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কারণ, কিরমানের শাসক কুরআন ছুঁয়ে শপথ করেছিল যে, সে আর কখনাে সাম্রাজ্যের প্রতি খেয়ানত করবে না। সে তার এই শপথ ভেঙে ফেললে তিনি দ্বিতীয়বারেও তাকে ক্ষমা করেন। তার রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল, উসমানি সাম্রাজ্যের পুনর্গঠন এবং তা অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে মজবুত করা। এ জন্যই তিনি কুসতানতিনিয়ার সম্রাটের সাথে সন্ধি করেন এবং তাকে ও তার মিত্রদেরকে কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী কিছু শহর এবং তাসালিয়ার কিছু শহর অর্পণ করে দেন।

কালিবুলির সাথে তার নৌ-বহরের পরাজয়ের পর তিনি কামানের সংস্কার করেন এবং ইউরােপ ও এশিয়ায় ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা নির্মূল করেন। তিনি তৈমুর লং কর্তৃক বিজিত কিছু অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে আনেন। তারা তার আনুগত্য এবং নেতৃত্ব মেনে নেয়।

সুলতান মুহাম্মদের জমানায় বদরুদ্দিন নামে একলােকের আবির্ভাব ঘটে। সে তার নামের সাথে আলেম উপাধি লাগিয়েছিল। সে ছিল সুলতান মুহাম্মদের ভাই মুসার অধিভুক্ত একজন সেনা। সে উসমানি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় সামরিক বিচারকের পদে আসীন হয়। এই বিচারককে মুসা ইবনে বায়েজিদ চুম্বন করেছিলেন।

শাকায়েকুন নােমানিয়্যাহ গ্রন্থকার বলেন- ‘শায়খ বদরুদ্দিন মাহমুদ ইবনে ইসরাইল ইবনে কাজি সিমাউনা নামে প্রসিদ্ধ। তুরস্কের ইউরােপীয় অংশে অবস্থিত রােমের আদ্রিয়ানােপল শহরের একটি গ্রামে বদরুদ্দিনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতাও ছিলেন সেখানকার মুসলিম সেনাবাহিনীর বিচারক।

সে কেল্লার বিজয় হয়েছিল তার হাতেই। শায়খ বদরুদ্দিনের জন্ম হয়েছিল উসমানি সুলতান গাজি খােদাওয়ান্দকার (প্রথম মুরাদ) এর সময়ে। বাল্যকালে তিনি তার পিতার কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি শাহেদি নামে একজন প্রসিদ্ধ আলেমের কাছে। কুরআন শেখেন এবং হিফজ সম্পন্ন করেন। মাওলানা ইউসুফের কাছে শেখেন নাই, সরফ। এরপর মিসর চলে যান। সেখানে গিয়ে মাওলানা সাইয়েদ শরিফ জুরজানির সাথে কায়রাের মাদরাসায় মাওলানা মােবারক শাহ মানতেকির কাছে পড়েন। এরপর তিনি মােবারক শাহের সাথে হজের সফর করেন। মক্কায় তিনি ইমাম জায়লায়ীর কাছে পড়েন। এরপর পুনরায় কায়রােতে ফিরে আসেন। এবার সাইয়েদ জুরজানির সাথে শায়খ আকমালুদ্দিন বাইবুরির কাছে পড়েন। আর এই বদরুদ্দিনের কাছেই পড়েছিলেন মিশরের সুলতান ফরজ, তিনি মিশরের মামলুক সাম্রাজ্যের সুলতান বারকুকের পুত্র ছিলেন।

••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

______পর্ব:১৭________Π________

এরপর শায়খ বদরুদ্দিন প্রভুর আকর্ষণবােধ করেন। তাই তিনি সে সময়কার মিসর অধিবাসী শায়খ সাইদ আল আখলাতির দরগাহে চলে যান। তিনি তার কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন। তার মুরিদ হন৷

শায়খ আখলাতি তাকে তিবরিজ শহরে সুফিবাদের প্রচারে প্রেরণ করেন। বর্ণিত আছে, তিনি যখন তিরিজে তৈমুর লং-এর কাছে যান তখন তার কাছ থেকে প্রচুর সম্পদ লাভ করেন। শায়খ সব ছেড়ে বালিসে চলে যান। এরপর মিসরে সফর করেন। সেখান থেকে চলে যান হালবে, সেখান থেকে কোনিয়ায় এবং সেখান থেকে রােমের তিবরায়। এরপর সাকিজ উপদ্বীপের রাজা তাকে দাওয়াত দেন এবং তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর গাজি উসমানের বংশধর মুসা যখন সালতানাতের অধিপতি হন তখন তাকে সামরিক বিচারক নিযুক্ত করেন। এরপর মুসার ভাই মুহাম্মদ মুসাকে হত্যা করেন এবং শায়খ বদরুদ্দিনকে তার পরিবার-পরিজনসহ আজনিক শহরে বন্দি করে রাখেন।

আজনিক তুরস্কে অবস্থিত একটি শহর। এখানেই শায়খ বদরুদ্দিন মাহমুদ ইবনে ইসরাইল তার নষ্ট আকিদার দিকে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। তিনি সম্পদ, ভােগবিলাস এবং ধর্ম সবকিছুতে সাম্য বিধানের দিকে মানুষকে আহ্বান করতে থাকেন। তিনি মুসলিম এবং অমুসলিমের মাঝে ধর্মীয় পার্থক্যে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলতেন, মানুষ সবাই ভাই ভাই। ধর্ম বিশ্বাস তাদেরকে পৃথক করে দিয়েছে। এমন মতের দিকেই ইহুদি মিশনারীরা দাওয়াত দিত। তিনি তার এই অসাড় মতের সাথে সহমত পােষণকারী কিছু গণ্ডমূর্খ এবং দুনিয়ালােভী দুরাচারীদের জুটিয়ে নেন। এই ফিতনাসৃষ্টিকারী বদরুদ্দিনের কিছু ভক্ত তৈরি হয়ে যায়। তারা মানুষকে তার মতের দিকে আহ্বান করতে থাকে। তাদের মধ্য প্রসিদ্ধ একজনের নাম বীর কলিজা মােস্তফা। আরেকজনের নাম হলাে তােরা কামাল। বলা হয়ে থাকে তার মূল ছিল ইহুদি। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জমানা থেকে আজ পর্যন্ত ইহুদিরা সর্বদা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং আছে।

বদরুদ্দিনের বিভ্রান্তিকর মত ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে এবং তার মতাবলম্বী বৃদ্ধি পেতে থাকে। সুলতান মুহাম্মদ জালবি এই বাতিল মতের বিরুদ্ধে সােচ্চার হন এবং তার এক সেনাপতিকে শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী দিয়ে বদরুদ্দিনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রেরণ করেন। আফসােসের কথা হলাে, মুহাম্মদ জালবির প্রেরিত সৈন্যদলের সেনাপতি সিসমান গাদ্দার বীর কলিজার হাতে নিহত হয় এবং তার বাহিনী পরাজিত হয়।

সুলতান মুহাম্মদ তার প্রধান উজির বায়েজিদ পাশার নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। তারা বীর কলিজার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাকে তার আস্তানা কোরা বােরনুতে নাস্তানাবুদ করেন। শায়খ বদরুদ্দিন তার ভ্রান্তিতে অবিচল থাকেন। তিনি মনে করেন, রাজ্যের কোণে কোণে যে বিচ্ছিন্নতা এবং বিশৃঙ্খলা চলছে এর মাধ্যমে অচিরেই তিনি রাজত্বের ক্ষমতা লাভ করবেন।

বদরুদ্দিন বলতেন, ‘আমি অচিরেই সারা বিশ্বের রাজা হব। আমার অদৃশ্য ইঙ্গিতবহ বিশ্বাস এর মাধ্যমে ইলমের শক্তি এবং তাওহিদের গােপনভেদ দিয়ে আমি বিশ্বকে আমার মুরিদদের মধ্যে বণ্টন করে দেব। আমি আহলে তাকলিদ তথা অনুসরণকারীদের মাজহাব এবং নিয়মকানুন' বাতিল করে দেব এবং আমার পানপাত্রের ব্যাপকতার মাধ্যমে কিছু হারামকে হালাল করব।রােমানিয়ার অন্তর্ভুক্ত ওয়ালাচিয়ারের শাসক এই নিম্নগামী, বিদআতি এবং জিন্দিককে মৌলিক এবং সামরিক সমর্থন দিত। আর সুলতান মুহাম্মদ জালৰি এই ফাসেদ মতকে দূর করার জন্য এবং তার কণ্ঠনালী চেপে ধরার জন্য ওত পেতে ছিলেন। ফলে বদরুদ্দিন বর্তমান বুলগেরিয়ার ডেলি ওরমান অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হয়।

মুহাম্মদ শরফুদ্দিন শায়খ বদরুদ্দিনের ডেলি ওরমান অঞ্চলে যাওয়া সম্পর্কে বলেন, এই ঘটনা এবং তারসাথে পরিবেষ্টিত যে সকল এলাকা আছে সেগুলােকে বাতেনিদের আশ্রয়স্থল বলা হয়ে থাকে। সে অঞ্চল বাবা ইসহাকের শিষ্য দ্বারা ভরপুর ছিল। তারা সপ্তম হিজরি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উসমানি সালতানাতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তাই শায়খ বদরুদ্দিনের এই স্থানের প্রতি মনােযােগ এবং তার হাজার হাজার সমর্থকদের একত্রিকরণ এবং এ অঞ্চল থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনাই বলে দেয় এই ভণ্ড শায়খ কেন এই জায়গাকে বেছে নিয়েছিলেন।

ডেলি ওরমান অঞ্চলে শায়খের নিকট ইউরােপীয় সাহায্য আসা শুরু হয়। উসমানি সুলতান প্রথম মুহাম্মদের বিরুদ্ধে তার অবাধ্যতার ফিতা আরও বিস্তৃত হয়ে যায়। ইসলামের শত্রু ভিন্নমতাবলম্বীদের সদস্য সংখ্যা পৌঁছে যায় সাত-আট হাজারে। সুলতান মুহাম্মদ সব বিষয়ে বেশ সতর্কতা এবং সজাগ দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন। অবাধ্যচারীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি মােটেও উদাসীন ছিলেন না।

তাই তিনি নিজেই শায়খ বদরুদ্দিনের সাথে লড়াই করার জন্য নেমে পড়েন। এক শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি ডেলি ওরমানের দিকে রওনা হন। সুলতান মুহাম্মদ বর্তমান গ্রিসে অবস্থিত সিরিউসকে তার সেনা পরিচালনার কেন্দ্র বানান। তার সেনাশক্তিকে তিনি বিদ্রোহীদের কাছে প্রেরণ করেন। তারা তাদেরকে পরাজিত করে। তাদের নেতা বদরুদ্দিন ডেলি সুলতান থেকে পালিয়ে ওরমানে আত্মগােপন করে।'

••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

________পর্ব:১৮________Π_______

সুলতান প্রথম মুহাম্মদ এর প্রতিনিধিদল অবাধ্যচারীদের কাতারে ফাটল ধরাতে সক্ষম হন এবং তাদের ব্যাপারে মজবুত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর ফলেই অবাধ্যদের প্রধান বদরুদ্দিনকে বন্দি করা হয়।সুলতান প্রথম মুহাম্মদ যখন বদরুদ্দিনের মুখােমুখি হলেন, তাকে বললেন, আমার কী হলাে! আমি আপনার চেহারায় হলুদ বর্ণ দেখছি কেন? বদরুদ্দিন জবাব দিল, সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগে হলুদবর্ণ ধারণ করে মালিক। সাম্রাজ্যের আলেমগণ বদরুদ্দিনের সাথে ইলমি মােনাজারায় লিপ্ত হন। এরপর তার বিরুদ্ধে শরয়ি বিচার বসানাে হয়। উলামায়ে কেরামের ফতওয়ার ওপর নির্ভর করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যার সূত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস “তােমাদের মধ্য হতে সবাই যখন একজনের বিরুদ্ধে একমত হয়, যে কিনা তােমাদের সিদ্ধান্তের বিরােধিতা করে এবং তােমাদের দলকে বিভক্ত করতে চায়, তাহলে তাকে হত্যা করাে।

বদরুদ্দিন যে ভ্রান্ত মতের দিকে আহ্বান করতেন তা ছিল ইহুদি মিশনারীদের মতাে। (পঞ্চদশ শতাব্দী হিজরি মােতাবেক বিংশ শতাব্দী খ্রিষ্টীয়)।

তিনি ইসলামি সহিহ আকিদার এবং ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতেন। কারণ, তিনি মুসলিম, ইহুদি, খ্রিষ্টান, গােপূজারি এবং কমিউনিস্টদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের কথা বলতেন। আর এটা ইসলামের আকিদার পরিপন্থী। ইসলাম শক্তভাবে বলে দিয়েছে, মুসলিমদের মাঝে এবং অন্যান্য ভ্রান্ত ধর্মাবলম্বী কোনাে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নেই। যারা আল্লাহ এবং তার রাসুলের সাথে যুদ্ধ করে তাদের মাঝে আর একত্ববাদী মুমিনদের মাঝে কীভাবে ভ্রাতৃত্ব হবে?'

সুলতান প্রথম মুহাম্মদ কবিতা, সাহিত্য ভালােবাসতেন। বলা হয়ে থাকে, তিনিই প্রথম উসমানি শাসক যিনি মক্কার আমিরের কাছে বাৎসরিক হাদিয়া পাঠাতেন। যেটাকে সররা বলা হতাে। সররা বলা হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ মুদ্রার অংশকে যা মক্কা এবং মদিনার দরিদ্রদের বণ্টন করার জন্য পাঠানাে হয়।

উসমানি প্রজাগণ সুলতান প্রথম মুহাম্মদকে ভালােবাসতেন। তারা ভালােবেসে তাকে পাহলােয়ান উপাধি দিয়েছিলেন। পাহলােয়ান অর্থ বীর, নায়ক। তারা তাকে এ উপাধি দিয়েছিলেন তার কর্মোদ্যমতা এবং বীরত্ব দেখে। তার মহৎ কর্মকাণ্ড এবং বিরল প্রতিভার কারণে, যার মাধ্যমে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং উসমানি সাম্রাজ্যকে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে গেছেন। তার উত্তম স্বভাব, আচরণ এবং প্রেমময়তা দেখে এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতি তার প্রতি দেখে তার প্রজাগণ তাকে ভালােবেসে জালবি উপাধিও দিয়েছিলেন। এটি একটি সম্মানজনক উপাধি, যার মধ্যে প্রেমময়তা এবং ব্যক্তিত্বের অর্থ রয়েছে। কতক উসমানি শাসক খ্যাতির দিক দিয়ে ছাড়িয়ে গেলেও তিনি ছিলেন উসমানি শাসকদের মাঝে সবচেয়ে বিচক্ষণ।

পশ্চিমা এবং ইউনানি ইতিহাসবিদগণ তার মানবতার কথা স্বীকার করেছেন। উসমানি ইতিহাসবিদগণ তাকে আখ্যা দিয়েছেন দক্ষ নাবিক এবং ক্যাপ্টেন হিসেবে। যিনি উসমানি সাম্রাজ্যের জাহাজকে দক্ষভাবে চালিত করেছেন যখন তাতারিদের হামলা, অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং বাতেনি ফেতনা তাকে গুটিয়ে নিয়েছিল।ইন্তেকাল......উসমানি সাম্রাজ্য যে ফিতনার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছিল তার চিহ্ন মিটানাের ক্ষেত্রে। এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাবিধানে সুলতান মুহাম্মদ তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন। করতেই তিনি উপলদ্ধি করেন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই তিনি বায়েজিদ। ভবিষ্যতে দাঙ্গা ফাসাদ যেন সৃষ্টি না হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ শান্তিপূর্ণ কাজ সম্পাদন করতে ইনতেকাল পাশাকে ডাকলেন এবং তাকে বললেন, 'আমি আমার ছেলে মুরাদকে খলিফা হিসেবে নির্বাচন করলাম, তাই তাকে অনুসরণ করবে। যেভাবে আমার সাথে সত্যবাদী ছিলে সেভাবে তার সাথেও সত্যবাদী থাকবে। আমি চাই তােমরা এখনই আমার কাছে। মুরাদকে নিয়ে আস। হয়তাে আমি এর পরে বিছানা থেকে উঠতে পারব না। তার আসার আগেই যদি প্রভুর ডাক এসে যায়, তাহলে সে এলে তারপর আমার মৃত্যুর ঘােষণা দেবে।'

|৮২৪ হিজরি মােতাবেক ১৪২১ খ্রিষ্টাব্দে আওরানা শহরে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

৪৩ বছর বয়সে তিনি তার সৃষ্টিকর্তার কাছে তার প্রাণপাখি সমর্পণ করেন। সুলতানের মৃত্যুর খবর জানাজানি হলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যার পরিণাম সুখকর হবে না—এই আশঙ্কায় সুলতানের দুই উজির ইবরাহিম এবং বায়েজিদ পাশা দ্বিতীয় মুরাদ আসার আগ পর্যন্ত সৈন্যদের কাছে সুলতানের মৃত্যুর খবর গােপন রাখার ব্যাপারে একমত হন।

তারা প্রচার করেন, সুলতান অসুস্থ। তারা সুলতানের ছেলের কাছে খবর পাঠান এবং ৪১ দিন পর তিনি উপস্থিত হয়ে রাজত্বের ক্ষমতা বুঝে নেন। সুলতান প্রথম মুহাম্মদ শান্তি, জ্ঞান এবং বিজ্ঞদের ভালােবাসতেন। এ জন্য তিনি সাম্রাজ্যের রাজধানীকে আদ্রিয়ানােপল (যােদ্ধাদের শহর) থেকে স্থানান্তর করে বুরুসায় (ফুকাহা তথা বিজ্ঞদের শহর) স্থানান্তর করেন। তিনি ছিলেন সমুন্নত চরিত্রবান, মজবুত ও অদ্বিতীয় সহনশীলতার অধিকারী এবং শত্রু মিত্রদের সাথে চলাফেরায় দুর্লভ নীতির অধিকারী।'

•••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

_____Π________পর্ব:১৯________Π________

◁সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ▷

সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ তার পিতা মুহাম্মদ জালবির ইনতেকালের পর ৮২৪ হিজরি মােতাবেক ১৪২১ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতায় আসীন হন। তখন তার বয়স ১৮ও অতিক্রম করেনি। তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করাকে এবং ইউরােপের সর্বত্র ইসলামের দিকে আহ্বান করাকে ভালােবাসতেন।তার খােদাভীরুতা, দয়া এবং ন্যায়পরায়ণতা ছিল সর্বজনবিদিত। সুলতান মুরাদ অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের দফারফা করতে সক্ষম হন। যে বিদ্রোহের শুরু হয়েছিল তার চাচা মুস্তফা এবং তাকে সমর্থনকারীর হাত ধরে। উসমানি সাম্রাজ্যের শত্রুদের হাত ধরে। বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় ম্যানুয়েল ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রের মূল হােতা। তার কারণেই সুলতান দ্বিতীয় মুরাদকে যত বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

এই দ্বিতীয় ম্যানুয়েলই সুলতান মুরাদের চাচা মুস্তফাকে সাহায্য-সহযােগিতা করেছিল। সুলতানের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুস্তফাত গালিয়ুবি শহর অবরােধ করেছিলেন। সুলতান মুরাদ তার চাচাকে গ্রেফতার করেন এবং বিদ্রোহের জন্য তাকে বিচারকার্যের সম্মুখীন করেন। এতদসত্ত্বেও দ্বিতীয় ম্যানুয়েল। সুলতানের বিরুদ্ধে তার চক্রান্ত অব্যাহত রাখে। সে সুলতানের এক ভাইয়ের সাথে আঁতাত করে তাকে আনাতােলিয়া শহরের নিকিয়ার ক্ষমতায় বসায়। মুরাদ সেই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে তার শক্তির নিরােধে সফল হন এবং তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। এরপর সেই ভাইকে হত্যা করা হয়।

এরপর থেকে সুলতান মুরাদ বাইজেন্টাইন সম্রাটকে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়ার মনস্থ করেন। তাই তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুলুলানিকের দিকে মনােযােগ নিবদ্ধ করেন। ৮৩৪ হিজরি মােতাবেক ১৪৩১ খ্রিষ্টাব্দে সেখানে হামলা করে তা দখল করে নেন। এরপর তা উসমানি সালতানাতের অবিচ্ছেদ্য * হয়ে যায়।

সুলতান মুরাদ বলকান অঞ্চলের বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের দিকেও তীক্ষ্ণ মনােযােগ দিয়েছিলেন। তাই সে অঞ্চলে উসমানি সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত করার দিকে ব্রতী হন। তিনি উসমানি সেনাবাহিনীকে ওলাশিয়া অঞ্চল অধিকৃত করার জন্য প্রেরণ করেন এবং তাদের ওপরে বাৎসরিক জিজিয়া আরােপ করেন। তিনি সার্বিয়ার নতুন সম্রাটকে (স্টিভ লাজার মিথস) উসমানি সাম্রাজ্যের সামনে অবনত হতে এবং তাদের শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করেন এবং তাদের ওপর কর্তৃত্ব নবায়ন করেন। এরপর উসমানি সেনাবাহিনী উত্তরের দিকে মনােযােগী হয়। সেখানে ইউনান তথা গ্রিস অঞ্চলে তারা উসমানি সাম্রাজ্যের ঘাঁটি স্থাপন করেন। সুলতান তার জিহাদের দাওয়াত পৌছিয়ে দেরি না করে হাঙ্গেরি এবং আলবেনিয়ার বিদ্রোহীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন।

৮৩৪ হিজরি মােতাবেক ১৪৩১ খ্রিষ্টাব্দে উসমানি সৈন্যরা আলবেনিয়া দখল করে নেয় এবং তার উত্তরাঞ্চলে তাদের আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করেন। তবে সেখানকার দক্ষিণাঞ্চলে উসমানি সেনাবাহিনী তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। আলবেনিয়া পর্বতমালার পাদদেশে আলবেনিয়ানরা উসমানি সেনাবাহিনীকে রুখে দিতে সক্ষম হয়। এভাবে তারা স্বয়ং সুলতান মুরাদ কর্তৃক পরিচালিত পরপর আরও দুটি আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে উসমানিরা ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়। খ্রিষ্টানরা আলবেনিয়ানদের এই বিজয়ের ফলে তাদের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যায়।

বিশেষ করে ভেনিস অঞ্চলের শাসকরা। তারা উসমানিদের এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বিজয় হলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা করছিলেন। কারণ, এ অঞ্চলের সামুদ্রিক সীমানা ভূমধ্যসাগরের সাথে মিলিত হয়ে ভেনিসের সাথে এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিত ছিল। তখন তারা ইদরিয়াতিক সমুদ্রের সীমাবদ্ধ এলাকায় ভেনিসের নৌ-বহরের প্রতিরােধে সক্ষম হতাে। এভাবেই সুলতান মুরাদ আলবেনিয়ায় উসমানি সাম্রাজ্যের স্থিতি দেখে যেতে পারেননি। আর হাঙ্গেরি ও তার আশপাশের অঞ্চলে উসমানিরা ৮৪২ হিজরি মােতাবেক ১৪৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হাঙ্গেরিয়ানদের পরাজিত করেন এবং তাদের ৭০ হাজার সৈন্য বন্দি করেন। পাশাপাশি আরও কিছু অঞ্চলে তারা কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

এরপর তারা সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড দখল করার জন্য সম্মুখ অগ্রসর হন; কিন্তু সুলতান তার এই চেষ্টায় ব্যর্থ হন। পােপের নেতৃত্বে ক্রুসেডীয় খ্রিষ্টানরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বড়সড় মিত্রবাহিনী গঠন করে ফেলে। এই মিত্রশক্তির লক্ষ্য ছিল ইউরােপ থেকে পুরােপুরিভাবে উসমানিদেরকে হটানাে। পােপ কর্তৃক পরিচালিত এই মিত্রশক্তির মধ্যে শরিক হয় হাঙ্গেরি, পােল্যান্ড, সার্বিয়া, ওয়ালাচিয়ার, জেনােয়া, ভেনিস এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। তাদের সাথে যােগ হয় আলমেনিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্রের পদাতিক বাহিনী। এই ক্রুসেডীয় মিত্র বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করা হয় হাঙ্গেরির ক্ষমতাধর সেনাপতি ইযুহনা দুনিয়াদিকে। দুনিয়াদি ক্রুসেডীয় স্থলবাহিনীকে নিয়ে উত্তরের দিকে দানিয়ুব অতিক্রম করে ফেলেন।

৮৪৬ হিজরি মােতাবেক ১৪৪২ খ্রিষ্টাব্দে উসমানিদের ওপর পরপর দুটি হামলা করেন। ফলে উসমানিরা সন্ধিচুক্তি করতে বাধ্য হয়। ৮৪৮ হিজরি মােতাবেক ১৪৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘সিজজাদান’ নামক এলাকায় এই চুক্তি ১০ বছরের জন্য নির্ধারণ করা হয়। সেখানে সুলতান মুরাদ সার্বিয়ার আধিপত্য ছেড়ে দেন। ‘জর্জ ব্রাংকোফেটস'কে সেখানকার শাসক মেনে নেন। এভাবে সুলতান মুরাদ ওয়ালাচিয়ারের এলাকা হাঙ্গেরিকে ছেড়ে দেন। তার জামাতা উসমানি সৈন্যবাহিনীর সেনাপতি মাহমুদ শিবলিকে মুক্ত করে আনেন। ৬০ হাজার ডিউকের উপস্থিতিতে হাঙ্গেরি এবং উসমানিদের উভয় ভাষায় সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়। হাঙ্গেরির শাসক ‘ল্যাডিসলাস’ ইঞ্জিল ছুঁয়ে এবং সুলতান মুরাদ কুরআন ছুঁয়ে শপথ করেন—তারা এই সন্ধিচুক্তির শর্তাবলি দায়িত্ব এবং সম্মানের সাথে পালন করবেন। ইউরােপীয় শত্রুদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন করে সুলতান মুরাদ আনাজুলে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তার ছেলে আমির ‘আলা’র মৃত্যু সংবাদ শুনে তিনি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তার শােক আরও গভীর হয়। তিনি দুনিয়াবিমুখতা অবলম্বন করেন। তার ছেলে মুহাম্মদের কাছে রাজত্ব হস্তান্তর করেন। তখন মুহাম্মদের বয়স ছিল মাত্র ১৪। অল্প বয়সের কারণে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ তার রক্ষণাবেক্ষণে রাজদরবারের কয়েকজন বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ লােককে নিয়ােজিত করেন। এরপর তিনি এশিয়া মাইনরের ম্যাগনেশিয়া অঞ্চলে চলে যান, যেন সেখানে তার অবশিষ্ট জীবন দুনিয়াবী ঝামেলামুক্ত এবং প্রশান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে দিতে পারেন।

তার রাজত্বের সকল অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তিনি নির্জনে আল্লাহ তাআলার ইবাদত এবং তার ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা- ফিকিরে মনােনিবেশ করেন। তবে এই নির্জনতা এবং ইবাদতের স্বাদ তিনি বেশি দিন উপভােগ করতে পারেননি। এমতাবস্থায় কার্ডিনাল সিজারিনি এবং তার কিছু সহযােগী উসমানিদের সাথে তাদের করা সন্ধিচুক্তি ভাঙার জন্য এবং ইউরােপ থেকে উসমানিদের একেবারে বের করে দেওয়ার জন্য লােকদেরকে আহ্বান করতে থাকে। এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল সুলতান মুরাদ কর্তৃক ছেলের কাছে সিংহাসন ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। রাজত্ব পরিচালনায় তখন যার কোনাে অভিজ্ঞতা এবং অবদান ছিল । পােপ চতুর্থ আওজিন এই শয়তানি চিন্তার ইন্ধনদাতা ছিল। সে খ্রিষ্টানদেরকে চুক্তি ভঙ্গের জন্য বলে এবং খ্রিষ্টানদের এবং মুসলিমদের মাঝে সংঘর্ষের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। সে বলেছিল, মুসলিমদের মাঝে এবং খ্রিষ্টানদের মাঝে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল। কেননা, তা জমিনে মাসিহের প্রতিনিধি পােপের অনুমতি ছাড়াই সম্পাদিত হয়েছে। আর কার্ডিনাল সিজারিনি ছিল বেশ উদ্যমী, সে কোনাে কাজ থেকেই পিছিয়ে থাকত না। সে উসমানিদের বিরুদ্ধে সর্বদা সচেষ্ট ছিল। এ জন্যই সে খ্রিষ্টান দেশগুলাে ঘুরে ঘুরে তাদের নেতাদেরকে মুসলিমদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করত।

আর যারা চুক্তি ভঙ্গের বিরােধিতা করত তাদেরকে বােঝাত। সে তাদের বলত, ‘পােপের নামে যে চুক্তিভঙ্গ করবে তারা দায়মুক্ত হবে এবং তাদের সৈন্য সামন্ত এবং অস্ত্রশস্ত্র বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তাদের জন্য উচিত হলাে, পােপের পথ অনুসরণ করা। এটাই সম্মান এবং মুক্তির পথ। এরপরও যার অন্তর তাকে বাধা দেয় এবং গুনাহের ভয় করে, সে-ই তার পাপের বােঝা বহন করবে।' খ্রিষ্টানরা তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্যদল প্রস্তুত করে। তারা কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী বুলগেরিয়ার ‘ফারনা’ শহর অবরােধ করে, যা মুসলিমদের হাতে স্বাধীন হয়েছিল। চুক্তি ভঙ্গ করা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ। তাই আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের জন্য চুক্তিভঙ্গকারীদের সাথে লড়াই করা আবশ্যক করেছেন। তিনি বলেন- ‘তােমরা কাফের নেতাদের হত্যা করাে। নিশ্চয় তারা কোনাে চুক্তি রক্ষা করে না, যেন তারা এই কাজ থেকে বিরত থাকে।' [সুরা তাওবা, আয়াত : ১২]

তারা কোনাে অঙ্গীকার, চুক্তি রক্ষা করে না। এটা তাদের সবসময়ের একটি স্বভাব। তারা কোনাে জাতির সাথে লড়াই করতে ভয় করে না। কোনাে দুর্বল মানুষকে দেখলেই তারা তাকে হত্যা করে, জবাই করে। আল্লাহ তাআলা বলেন-“তারা কোনাে মুমিনের ব্যাপারে কোনাে আত্মীয়তা এবং অঙ্গীকারের প্রতি গুরুত্ব দেয় না। তারাই হলাে সীমালঙ্ঘনকারী।' [সুরা তওবা, আয়াত : ১০]'

••উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস•••

[][][][]__'_________Π________পর্ব:২০________Π________ ━

◁যুদ্ধ/সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের ইন্তেকাল▷━-

উসমানি সাম্রাজ্যের দিকে খ্রিস্টানদের এই হামলার পরিকল্পনার সময় আদ্রিয়ানোপলের মুসলমানগন ক্রুসেডারদের এই হামলার কথা শুনতে পান এবং তাদেরকে ভয়-ভীতি গ্রাস করে নেয়।সাম্রাজ্যের অধিবাসীরা সুলতান মুরাদ এর কাছে দূত প্রেরণ করে থাকে জলদি এসে এই দুর্যোগ মােকাবিলা করার জন্য বলে। মুজাহিদ সুলতান ক্রুসেডীয় দুর্যোগের বিরুদ্ধে উসমানিদেরকে পরিচালনার জন্য তার নির্জনতা থেকে বের হয়ে আসেন। সুলতান মুরাদ জেনােয়ার সাথে চুক্তি করতে সক্ষম হন, যেন তারা ৪০ হাজার উসমানি সৈন্যকে তাদের নৌযানের মাধ্যমে এশিয়া থেকে ইউরােপে নিয়ে যায়। এই চুক্তি হয়েছিল ক্রুসেডারদের নৌ-বহরের নাকের ডগায়। প্রত্যেক উসমানি সেনার বিনিময় নির্ধারণ করা হয় জনপ্রতি এক দিনার। সুলতান মুরাদ তার অভিযানে বেশ দ্রুততা অবলম্বন করেন। ফলে তিনি সেদিনই ভারনায় পৌঁছেন যেদিন সেখানে ক্রুসেডার সৈন্যরা পৌঁছেছিল।

পরের দিনই মুসলিম এবং খ্রিষ্টান উভয় বাহিনীর মাঝে লড়াই শুরু হয়ে যায়; তা ছিল খুবই অস্থির এবং ভয়াবহ লড়াই। সুলতান মুরাদ যে সন্ধিচুক্তি লিপিবদ্ধ করেছিলেন তারা তিরবিদ্ধ করে তা টুকরাে টুকরাে করে ফেলে। যেন তারা মুসলিমদের এবং আসমান ও জমিনকে তাদের শত্রুতা এবং গাদ্দারি দেখাতে পারে এবং তাদের সৈন্যদের মধ্যে উদ্দীপনা বৃদ্ধি করতে পারে। দু-পক্ষ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। তাদের মধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। এ যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের বিজয় হতে পারত। কারণ, তাদের ধর্মীয় ক্রোধ ছিল, অধিক উদ্দীপনা ছিল। কিন্তু তাদের এই ক্রোধ এবং উদ্দীপনা উসমানিদের জিহাদিশক্তির সামনে ধুলােয় মিশে যায়। চুক্তিভঙ্গকারী হাঙ্গেরির রাজা ‘লাডিসলাস’ এবং চুক্তি পরিপূর্ণকারী সুলতান মুরাদ যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পর মুখােমুখি হন। তাদের দুইজনের মাঝে তুমুল লড়াই হয়। অবশেষে সুলতান হাঙ্গেরির খ্রিষ্টান রাজাকে হত্যা করতে সক্ষম হন। তিনি তাকে তিরের এক শক্ত আঘাতে ধরাশয়ী করে দেন এবং তাকে তার ঘােড়ার পিঠ থেকে ভূ-তলে ফেলে দেন। এরপর কিছুসংখ্যক মুজাহিদ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তার মাথা ধড় থেকে ছিন্ন করে রক্তাক্ত তিরের ডগায় রেখে আনন্দ চিত্তে ‘আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিতে দিতে উত্তােলন করে। একজন মুজাহিদ শত্রুদের লক্ষ করে চিৎকার দিয়ে বলেন, 'হে কাফেরের দল, এই দেখ তােদের রাজার মাথা।' সমস্ত খ্রিষ্টান সৈন্যদের ওপর এই দৃশ্যটি বিরাট প্রভাব ফেলে। ভয়-ভীতি তাদেরকে গ্রাস করে নেয়। এরপর মুসলিমরা তাদের ওপর জোরদার হামলা করে। তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে শােচনীয়ভাবে পরাজিত করে। খ্রিষ্টানরা পরস্পরকে সামাল দিতে দিতে পলায়ন করে। সুলতান মুরাদ এখানেই ক্ষান্ত থাকেন। তার শত্রুদেরকে আর পিছু ধাওয়া করেননি। নিশ্চয় এটি ছিল বিরাট বিজয়।এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল কসােভাের সমভূমিতে।

১৪৪৮ খ্রিষ্টাব্দের (৮৫২ হিজরি) ১৭ অক্টোবরে। যুদ্ধের সময় ছিল তিন দিন। উসমানিগণের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে। এ যুদ্ধ কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য হলেও হাঙ্গেরিকে ওই সমস্ত সাম্রাজ্য থেকে ছিটকে দেয়, যারা উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সাহস করতে পারত। সুলতান মুরাদ তার রাজত্ব এবং দুনিয়াবিমুখতা ত্যাগ করেননি। তিনি আরেকবার তার ছেলের হাতে রাজত্ব সঁপে দিয়ে ম্যাগনেশিয়ায় তার নির্জনবাসে ফিরে যান। যেভাবে বিজয়ী সিংহ তার আস্তানায় ফিরে যায়। যে সমস্ত সুলতান ও রাজাগণ তাদের রাজত্ব, সিংহাসন ছেড়ে দিয়েছেন, রাজত্বের আরাম আয়েশ এবং মানুষের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনতা বেছে নিয়েছেন তাদের সবার কথাই ইতিহাস আমাদের জানিয়েছে। তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ আবার তাদের রাজত্বে ফিরে এসেছেন; কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ব্যতীত এমন কাউকে পাওয়া যায়নি যিনি দুইবার তার রাজত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি ছােট এশিয়া মাইনর, যেখান থেকে তিনি চলে এসেছেন, সেখানে আর ফিরে যেতে চাননি। ফলে আদ্রিয়ানােপলের জেনেসারি সৈন্যরা বিদ্রোহ ঘােষণা করে দাঙ্গা ফাসাদ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

সুলতান মুহাম্মদ তখন ছিলেন একজন অল্পবয়সী, অপরিণত যুবক। সাম্রাজ্যের কিছু দায়িত্বশীলগণ এই ব্যাপারটি আরও ব্যাপক হওয়ার এবং বিপদ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন। তারা আশঙ্কা করেন যেন অনিষ্ট আর না ছড়ায় এবং এর শােচনীয় পরিণাম না হয়। তাই তারা আবার সুলতানের কাছে দূত পাঠিয়ে অবস্থা নিয়ন্ত্রণের আবেদন জানান। সুলতান মুরাদ আবার ফিরে এসে তাদের লাগাম টেনে ধরেন। জেনেসারিরা তার সামনে মাথা নত করে। তিনি ছেলে মুহাম্মদকে আনাজুলের প্রশাসক বানিয়ে ম্যাগনেশিয়ায় পাঠিয়ে দেন। এরপর তিনি তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত উসমানি সাম্রাজ্যের সিংহাসন ধরে রাখেন এবং যুদ্ধ ও বিজয়ের ভেতর জীবন কাটিয়ে দেন।

━━━━━━━মুরাদ এবং তার সভাকবি,আলেম এবং সৎ কাজের প্রতি ভালোবাসা পোষণ━━━━━━━━-

মুহাম্মদ হারব বলেন, দ্বিতীয় মুরাদ যদিও কবিতা কম লিখেছেন এবং আমাদের কাছে। তার খুব কম কবিতাই আছে, তবে তিনি কবি, সাহিত্যিকগণকে সম্মান করতে কুণ্ঠাবােধ করতেন না। তিনি কবিগণকে অনেক পুরস্কার দিয়েছেন। কবিদের তিনি প্রতি সপ্তাহে দুই দিন তাদের স্বরচিত কবিতা শােনানাের জন্য তার মজলিসে ডাকতেন। তাদের মাঝে এবং সুলতানের মাঝে নানা আলাপচারিতা এবং কথাবার্তা হতাে। কেউ সমাদৃত হতাে আবার কেউ অনুযােগের কবলে পড়ত। কেউ পছন্দনীয় হতাে আবার কেউ বিতাড়িত হতাে৷ অধিকাংশ সময় তিনি প্রতিভার পুরস্কার দিয়ে অথবা কোনাে পেশা নির্ধারণ করে দিয়ে তাদের মধ্য হতে দরিদ্রদের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে দিতেন। যেন তারা জীবিকার পেরেশানি থেকে মুক্ত হয়ে পুরােপুরিভাবে কবিতা রচনায় মনােযােগী হতে পারেন। তার সময়কাল অনেক কবিকে ভূমিষ্ঠ করেছিল।''২১৭ রাজপ্রাসাদের আশপাশে বিভিন্ন শাস্ত্রের শিক্ষা একাডেমি ছিল। অবস্থা এমন ছিল যে, তৎকালীন কবিগণও জিহাদের ময়দানে সুলতানের সাথে থাকতেন। সুলতান মুরাদের একটি কবিতা হচ্ছে— ‘এসাে সবাই জিকির করি আল্লাহ তাআলার/আমরা তাে নই চিরস্থায়ী এই দুনিয়ার।'তিনি ছিলেন বিজ্ঞ, বুদ্ধিমান, ন্যায়পরায়ণ এবং বীর শাসক। তিনি হারামাইন শরিফের অধিবাসীদের জন্য তার সম্পদ থেকে প্রতি বছর ৩ হাজার ৫০০ দিনার দান করতেন। তিনি ইলমের, আলেমগণের এবং পির-মাশায়খগণের সম্মান করতেন এবং তাদের প্রতি খেয়াল রাখতেন। তিনি তার রাজত্বকে সুবিন্যস্ত করেছেন। পথ-ঘাট নিরাপদ করেছেন। শরিয়ত এবং ধর্মের বিধান প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর কাফের এবং নাস্তিকদের করেছেন নাস্তানাবুদ। তার সম্পর্কে ইউসুফ আসাফ বলেন, তিনি ছিলেন খােদাভীরু, একজন অদ্বিতীয় নায়ক। কল্যাণপ্রেমী এবং দয়া ও সহানুভূতিশীল।

━━━━━━তার মৃত্যু এবং অসিয়ত━━━━━━━-

আননুজুমুজ জাহিরাহ গ্রন্থকার ৮৫৫ হিজরিতে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের মৃত্যুসম্পর্কে বলেন— “তিনি সম্মান এবং মর্যাদার দিক দিয়ে সময়ের শ্রেষ্ঠ বাদশাহ ছিলেন। তার মাঝে ছিল বুদ্ধিমত্তা, সহনশীলতা, দৃঢ়তা, সম্মানবােধ, বীরত্ব এবং নেতৃত্বের গুণ। তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে করতে জীবন নিঃশেষ করে দেন। বহু যুদ্ধে অংশ নেন। বহু যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। শত্রুকে পরাজিত করে বহু দুর্ভেদ্য দুর্গ এবং কেল্লার অধিপতি হন।তিনি নফসের চাহিদা মিটানাের ক্ষেত্রে একেবারে উদাসীন ছিলেন। তার অবস্থা ছিল তেমন যেমনটি কোনাে এক বিজ্ঞ লােক বলেছিলেন। তাকে তার দ্বীন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে । তিনি বলেছিলেন, “আমি গােনাহের মাধ্যমে তাকে বিচ্ছিন্ন করি আর ইস্তেগফারের মাধ্যমে তা জোড়া দিই। তাই তিনি আল্লাহর ক্ষমাশীলতা এবং মর্যাদার অধিক হকদার। তার রয়েছে অনেক প্রসিদ্ধ অবদান। ইসলামের সমৃদ্ধি এবং শত্রুকে কোণঠাসা করার ক্ষেত্রে রয়েছে গৌরবােজ্জ্বল ইতিহাস। তাই তার সম্পর্কে বলা হয়েছিল—“তিনি ছিলেন ইসলামের প্রাচীরস্বরূপ। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং তাকে জান্নাত দান করুন। তিনি ৪৮ বছর বয়সে আদ্রিয়ানােপলের প্রাসাদে ইনতেকাল করেন। অসিয়ত অনুযায়ী তাকে বুরুসায় জামে মুরাদিয়ার পাশে সমাহিত করা হয়। তিনি অসিয়ত করে যান, তার কবরের ওপরে যাতে কিছু নির্মাণ করা না হয়। আর কবরের পাশে কিছু ঘর নির্মাণ করতে বলেন। যার মধ্যে হাফেজগণ কুরআন তিলাওয়াত করবেন। সবশেষে তাকে জুমার দিন দাফন করতে বলেন। তার অসিয়ত বাস্তবায়ন করা হয়।' তিনি তার অসিয়তনামায় কিছু কবিতা লিখে যান। বড় কবরে তার দাফন হওয়ার ভয় করতেন। তিনি চাইতেন তার দাফনস্থলে যেন কিছু নির্মাণ করা না হয়। তাই তিনি এ সম্পর্কে কবিতা লিখে যান, ‘মানুষ যেদিন দেখতে আসবে সেদিন যেন তারা সেখানে আমার মাটি দেখতে পায়।'সুলতান মুরাদ অনেক জামে মসজিদ এবং মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক প্রাসাদ এবং খনি নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে তিন তলাবিশিষ্ট আদ্রিয়ানােপলের জামে মসজিদ। এই মসজিদের পাশে তিনি একটি মাদরাসা এবং সরাইখানা নির্মাণ করেছিলেন, যাতে তিনি ফকির মিসকিনদের খাওয়াতেন।