April 7, 2022

Pakistans Political History

কেন যেন আমরা যখন রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করি, তখন প্রচণ্ডরকমের কনফর্মেশন বায়াসে ভুগি। আমরা আগে থেকেই ঠিক করে নেই, আমাদের পছন্দের দল কোনটা। কাকে আমরা সমর্থন দেবো! তারপর সেই দলের পক্ষে তথ্য, উপাত্ত যোগাড় করা শুরু করি।

যেমন এখন পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ফেইসবুক বেশ গরম। যারা একটু জেনারেল লাইনের কিংবা বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতি করেন তারা ইমরান খানের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। আবার যারা কওমী-দেওবন্দি ধারার তারা মাওলানা ফজলুর রহমানের পক্ষে লেখা লিখছেন। কারণ মাওলানা সাহেব দেওবন্দি ধারার।

কিন্তু আমরা যদি এই কনফার্মেশন বায়াসটা একপাশে রেখে তারপর ঘটনা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে হয়তো অনেককিছু পরিষ্কার হবে। যদিও নিজেকে বায়াসড মুক্ত দাবি করা অসত্যের আশ্রয় নেয়ার শামিল। কারণ, আমাদের সবার মাঝেই কম-বেশি পক্ষপাতিত্বের রোগ আছে।

সেক্ষেত্রে এক কাজ করা যায়। একদম সংক্ষেপে পাকিস্তানের রাজনীতির ইতিহাসে চোখ বুলানো যাক।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয়ের পর জুলফিকার আলী ভুট্টো বেশ ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। সত্তরের দশকে অন্য সব মুসলিম দেশের শাসকদের মতো তার মাথাতেও সমাজতন্ত্রের ভূত চাপে। যদিও ষাটের দশকে পাকিস্তানের অর্থনীতির চাকা বেশ ভালোই সচল ছিলো। আইয়ুব খানের ক্যাপিটালিজমের কারণে ষাটের দশকে পাকিস্তানকে এশিয়ার রাইজিং টাইগার বলা হতো।

কিন্তু ভুট্টোর ভুল পলিসির কারণে অর্থনীতি খুব খারাপ অবস্থায় না গেলেও আইয়ুব খানের যুগের মতো ছিলো না। যেটা নিয়ে মানুষের মাঝে অসন্তোষ ছিলো। ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রতিষ্ঠা করেন। যেটাকে পাকিস্তানে বাম ঘরনার রাজনৈতিক দল বলা হয়। বাম বা লিবারেল চিন্তাধারার মানুষের কাছে এই দল খুবই জনপ্রিয় ছিলো। এখনো আছে।

ভুট্টোর দলের বিরুদ্ধে কেবল বামধারার মার্ক্সিজমের দাগই লাগে নি, লেগেছিলো দুর্নীতির দাগও। তাই জেনারেল জিয়া যখন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন এবং একটা খুনের মামলায় ১৯৭৯ সালে ভুট্টোর ফাঁসির ব্যবস্থা করেন, পাকিস্তানে জনগণ তেমন কোনো প্রতিবাদও করেনি ভুট্টোর পক্ষে।

তাছাড়া ভুট্টো ইমরান খানের মতো পশ্চিমা ব্লক থেকে বের হতে চেয়েছিলেন বলে অনেকে মনে করেন তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। ভুট্টোর দল করতো বাম ধারার রাজনীতি। তাই জেনারেল জিয়া পাকিস্তানে ধর্মীয় জাগরণ ঘটিয়ে ভুট্টোর মতাদর্শ উৎখাত করার চেষ্টা করলেন। আর তাতে পশ্চিমাদের সমর্থনও পেলেন। কারণ, সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে আফগান ও পাকিস্তানিদের মাঝে ধর্মীয় চেতনার পুর্নজাগরণ ঘটানোর প্রয়োজন ছিলো।

জেনারেল জিয়ার নিয়ত যা-ই থাকুক, এর ফলে পাকিস্তানে ইসলামপন্থীদের বেশ ফায়দা হয়েছিলো। যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ইসলামের লেশমাত্রও ছিলো না, সেখানে ইসলামের কিছু বিধিবিধান প্রবেশ করলো। অন্যসব স্বৈরশাসকদের মতো জেনারেল জিয়ারও একটি গৃহপালিত বিরোধী দলের প্রয়োজন ছিলো। সেই গৃহপালিত বিরোধী দল থেকেই নওয়াজ শরীফের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। পাকিস্তানের রাজনীতি বুঝতে চাইলে নওয়াজ শরীফের নামটা মাথায় গেঁথে ফেলা প্রয়োজন। কারণ, তিনি একবার না, দুইবার না, তিন-তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

আমরা সবাই জানি, প্রয়োজন ফুরোলে আমেরিকানরা তার দাসদের টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে। আমেরিকানদের যখন আর জেনারেল জিয়ার প্রয়োজন রইলো না, তখন একদিন আকস্মাৎ তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলেন। যদিও সেটা আদৌ দুর্ঘটনা ছিলো কিনা, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। তখন ১৯৮৮ সাল। ভুট্টোর ফাঁসির পর প্রায় দশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে।

জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর পাকিস্তানে সিভিল ডেমোক্রেসি আসে। এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের পছন্দের লোক ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে বেনজীর ভুট্টো। তিনি তার বাবার দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির হাল ধরেন। পাকিস্তানে বেনজীর ভুট্টোর আহামরি কোনো অবদান না থাকার পরেও শুধুমাত্র তার পশ্চিমাঘেষা নীতির কারণে পশ্চিমামহলে তিনি অনেক হাইলাইটেড হতেন।

একটু আগে জেনারেল জিয়ার সময় গৃহপালিত বিরোধী দলে জন্ম নেয়া নওয়াজ শরীফের কথা বলেছিলাম, মনে আছে? তিনি একটি দল গঠন করেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নুন)। উর্দুতে নওয়াজ শরিফ লিখতে গেলে প্রথমে নুন লিখতে হয়, সেখান থেকে এসেছে নুন।

নওয়াজ শরীফ, বেনজীর ভুট্টোর বিপরীতে ডানপন্থী রাজনীতি শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা বিরাজমান ছিলো। পিপলস পার্টি সরকার গঠন করলে মুসলিম লীগ সে সরকার বিভিন্ন কৌশলে ভেঙ্গে দিতো। আবার নির্বাচন হতো। নির্বাচনে মুসলিম লীগ ক্ষমতায় আসতো। তখন পিপলস পার্টি তাদের সাথে একই কাজ করে সরকার ভেঙ্গে দিতো। এভাবে লম্বা সময় ধরে রাজনৈতিক সার্কাস চলছিলো।

১৯৯৮ সালে নওয়াজ শরীফের দল দুই-তৃতীয়াংশ সিট নিয়ে ক্ষমতায় আসে। সবাই মনে করা শুরু করে, এবার হয়তো একটা শক্তিশালী দল ক্ষমতায় এসেছে। একে উৎখাত করা সম্ভব হবে না। রাজনীতিতে অচলাবস্থার অবসান ঘটবে। নওয়াজ শরীফের আমলে সংবিধানে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়। তার আমলেই পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও গুজব আছে, নওয়াজ শরিফ পশ্চিমাদের ভয়ে নিউক্লিয়ার টেস্ট করতে চাচ্ছিলেন না। মিলিটারির ভয়ে করতে বাধ্য হন।

সংসদে অনেক সিট থাকায় নওয়াজ শরীফের দল একসময় বেপোয়রা হয়ে উঠে। নওয়াজ শরীফ নিজেও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে বিভিন্ন কলকারখানা খুলে ব্যবসা শুরু করেন। ফলে পাকিস্তানে দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করে।

নওয়াজ শরীফ বুঝতে পেরেছিলেন, তার এই অফুরন্ত ক্ষমতার পেছনে একমাত্র বাধা হচ্ছে আর্মি। তাই তিনি আর্মির ওপর নিজের কর্তৃত্ব জাহির করার জন্যে সেনাপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র সেনাবাহিনীর অফিসারকে বরখাস্ত করেন। তার এ আচরণ জনগণের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জনগণের এ প্রতিক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। অনেকে জেনে অবাক হবেন, যেই নওয়াজ শরীফের আমলে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হয়েছিলো, তাকে যখন আর্মি ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিলো তখন মানুষ মনের আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করেছিলো। বড়ো বড়ো শহরগুলোতে সব মিষ্টি বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো।

নওয়াজ শরীফের পর পারভেজ মোশাররফ একদম বিপরীত পলিসি নিয়ে আসেন পাকিস্তানে। পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানে বেশ শক্তভাবে ডি-ইসলামাজাইশনের কাজ শুরু করেন। কারণ, তখন তথাকথিত ওয়ার অন টেরর শুরু হচ্ছে। আমেরিকানদের আবার পাকিস্তানিদের সাহায্য প্রয়োজন। পাকিস্তানিরা অনুগত দাসের মতো আমেরিকানদের নির্দেশ মানা শুরু করে দিলো। আফগানদের বলল, সোভিয়েতদের সাথে তোমরা যা করেছো, সেটা জিহাদ ছিলো। কিন্তু এখন যেহেতু আমেরিকানরা এসেছে, এখন আর তা জিহাদ না। এখন আমেরিকানদের বাধা দিলে সেটা সন্ত্রাস হবে।

ওয়ার অন টেররে যোগ দেয়া সম্ভবত ১৯৭১ সালের অপারেশন সার্চ লাইটের পর পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচে’ ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো। আফগান মুজাহিদরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মার্কিনিদের দোসর ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধেও জিহাদের ডাক দেয়। পাকিস্তানে বিভিন্ন জিহাদি দল জন্ম নেয়। কয়েক বছরের মধ্যে পাকিস্তান হয়ে উঠে পৃথিবীর সবচে’ বিপদজনক জায়গা।

আশি হাজার পাকিস্তানি এ যুদ্ধে প্রাণ হারায়। অথচ এ যুদ্ধে পাকিস্তানিদের যোগ দেয়ার কোনো কারণই ছিলো না। পাকিস্তানের পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে ড্রোন হামলা করে আমেরিকানরা। আর এ হামলা পাকিস্তানের সরকারি দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থনেই হয়। অনেকে জেনে অবাক হবেন, আমাদের অনেকের প্রিয় মাওলানা ফজলুর রহমানও মার্কিনিদের ড্রোন হামলার পক্ষে যে গণস্বাক্ষর নেয়া হয়, তাতে স্বাক্ষর দেন।

পারভেজ মোশাররফেরও যখন একটা গৃহপালিত রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন দেখা দিলো, তখন তিনি নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগের মাঝে ভাঙ্গন সৃষ্টি করলেন। মুসলিম লীগ (নুন) ভেঙ্গে সৃষ্টি হলো নতুন আরেকটি দল মুসলিম লীগ (ক্বাফ)। চৌধুরী সুজাত হোসাইন এবং পারভেজ এলাহি এ দলের নেতৃত্ব দেন। পারভেজ এলাহি পাঞ্জাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। পাশাপাশি বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজও তিনি করেন।

আমেরিকানরা যখন দেখতে পায় পারভেজ মোশাররফকে দিয়ে আর কাজ হচ্ছে না, তখন তারা পারভেজ মোশাররফের জন্যে একটা সেইফ এক্সিটের ব্যবস্থা করে দেয়। শর্ত হচ্ছে, পিপলস পার্টিকে আবার ক্ষমতায় আনতে হবে। কিন্তু ২০০৮ সালে পিপলস পার্টি ক্ষমতায় আসার আগেই ২০০৭ সালে বেনজীর ভুট্টো বোমা হামলায় মারা যান। ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের সমবেদনা সৃষ্টি হয় তার প্রতি। কারণ, তার বাবা জুলফিকার আলী ভুট্টোকেও অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেয়া হয়েছিলো।

পাবলিকের এ সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই পিপলস পার্টি ক্ষমতায় চলে আসে। শুরু হয় পাকিস্তানের অর্থনীতির অন্ধকার যুগ। পিপলস পার্টি আর মুসলিম লীগ (নুন) এ দুটি দল ছিলো তখন পাকিস্তানের সবচে’ বড়ো রাজনৈতিক দল। আর দুটি দলই হচ্ছে পরিবারতান্ত্রিক দল। যেমন- জুলফিকার আলী ভুট্টোর পর এসেছেন তার মেয়ে বেনজীর ভুট্টো। বেনজীর ভুট্টোর পর এখন পিপলস পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছে বেনজীর ভুট্টোর ছেলে বিলওয়াল ভুট্টো, যে বেচারা কিনা ঠিকমতো উর্দুও বলতে পারে না। নেতৃত্বের কোনো গুণই তার মাঝে নেই, যেমনটা ছিলো তার নানা জুলফিকার আলী ভুট্টোর মাঝে।

মুসলিম লীগ (নুন) — এরও একই অবস্থা। নওয়াজ শরীফের পর এ দলের হাল এখন ধরেছেন নওয়াজ শরীফের ভাই শেহবাজ শরীফ, আর তার ছেলে হামজা শেহবাজ। নওয়াজ শরীফের মেয়ে মরিয়াম নওয়াজও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।

২০০৮-১৩ পর্যন্ত পিপলস পার্টি এবং ২০১৩-১৮ পর্যন্ত মুসলিম লীগ (নুন) ক্ষমতায় থাকে। এই দুই দল ক্ষমতায় থাকাকালেই পাকিস্তানের শাসকদের দুর্নীতির কথা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। পিপলস পার্টির প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি দুর্নীতির কারণে পদচ্যুত হন। বেনজীর ভুট্টোর স্বামী আসিফ জারদারির দুর্নীতির কারণে সবাই তাকে মিস্টার টেন পার্সেন্ট বলে ডাকত।

পিপলস পার্টির পর ২০১৩ সালে মুসলিম লীগ (নুন) ক্ষমতায় আসে। মুসলিম লীগের আমলে পেনামা পেপার ফাঁস হয়। সেখানে নওয়াজ শরীফের বিশাল বিশাল দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আবারো পাকিস্তানের একজন প্রধানমন্ত্রীকে সে দেশের সুপ্রীম-কোর্ট পদচ্যুত করে দুর্নীতির কারণে। মুসলিম লীগ এ কারণে সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করা শুরু করে।

আর্মির সাথে মুসলিম লীগ (নুন) ও পিপলস পার্টির তিক্ততার ইতিহাস রয়েছে। আর্মির কারণে নওয়াজ শরিফ নব্বইয়ের দশকে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। আর্মির কারণেই পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি হয়েছিলো। পাকিস্তানে আর্মি তাই সবসময় আশঙ্কায় থাকে, এ দুটি দল কোনদিন না যেন পাকিস্তানের আর্মির ক্ষমতা হ্রাস করে একে পাঞ্জাব পুলিশের মতো তামাশার পাত্র বানিয়ে ফেলে।

ঠিক এ সময়ে উত্থান ঘটে ইমরান খানের তেহরিকে ইনসাফের। ইমরান খান আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিলেন পাকিস্তানে। কাঁধের ইনজুরি নিয়ে খেলার পরেও তিনি পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জেতান। নিজের মা যখন ক্যান্সারে মারা যান, তখন তিনি জানতে পারেন পাকিস্তানে কোনো ক্যান্সার হাসপাতাল নেই। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শওকত খানম হাসপাতাল। এটা পৃথিবীর একমাত্র প্রাইভেট হাসপাতাল যেখানে ৭০ ভাগ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়।

অন্যসব খেলোয়াড়রা যখন ক্যারিয়ার থেকে অবসর নেয়ার পর কোচিং-ধারাভাষ্য কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য করা শুরু করে অথবা ক্ষমতাসীন দলের ছাতার নীচে যেয়ে ফ্রি ফ্রি রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করে, ইমরান খান সেখানে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠা করেন তার রাজনৈতিক দল তেহরিকে ইনসাফ।

শুরুতে এ দল তেমন কোনো জনসমর্থনই পায় নি। তবে ২০১১ সালের পর থেকে, বিশেষ করে মিনারে পাকিস্তানের জনসভার পর থেকে, ইমরান খানের দল জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করে। ইমরান খান সম্পূর্ণ নতুন এক ন্যারেটিভ নিয়ে পাকিস্তানিদের সামনে আসেন। সে ন্যারেটিভে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি ছিলো না, নতুন পাকিস্তানের স্বপ্ন ছিলো, ছিলো ইসলামের মাধ্যমে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি। বহুবছর পর পাকিস্তানের জনগণ কোনো দলের নেতার কাছ থেকে আল্লামা ইকবাল, জিন্নাহর স্বপ্নের কথা শুনতে পায়। এছাড়া ইমরান খান প্রো-আর্মি হওয়ায় আর্মির অফিসাররাও তাকে পছন্দ করতো। এখনো করে।

ইমরান খানের রাজনৈতিক উত্থানে বেশ বড়ো ভূমিকা রাখেন তার ব্যবসায়ী বন্ধু জাহাঙ্গীর তারিন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাবে তেহরিকে ইনসাফের শোচনীয় পরাজয়ের পর জাহাঙ্গীর তারিন ইমরান খানকে পরামর্শ দেন, আদর্শিক রাজনীতি না করে পাওয়ার পলিটিক্স করতে। নতুবা পাকিস্তানে কখনো ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হবে না। আর ক্ষমতায় না গেলে পাকিস্তানকে বদলানোও সম্ভব না।

ইমরান খান তার বন্ধু জাহাঙ্গীর তারিনের পরামর্শ গ্রহণ করেন। নিজের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে তাকে সিট এনে দিতে পারবে এমন এমন লোকদের নিজের দলে ভেড়ানো শুরু করেন। ফলও পান হাতে নাতে। ২০১৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেও তার ক্ষমতা খুব সীমিত হয়ে পড়ে। যেটার কারণে অনেকে তাকে আর্মির পুতুল বলে। তবে খেয়াল করলে, এর পেছনে অন্য কারণও দেখতে পাওয়া যাবে।

পাকিস্তানে সরকার গঠন করতে ১৭২টি আসন প্রয়োজন। ইমরান খানের দল ২০১৮ সালে পেয়েছিলো ১৪৯টি সিট। বাকি সিট তারা কীভাবে পূরণ করেছিলো? বিভিন্ন দল থেকে সংসদ সদস্যদের নিজের দলে এনেছিলো। মোশাররফের আমলে তৈরী হওয়া দল, মুসলিম লীগ (ক্বাফ) — এর কাছে ৫টি সিট ছিলো। এ দলের নেতা পারভেজ এলাহিকে ইমরান খান পাঞ্জাবের সবচে’ বড়ো ডাকাত বলতেন। প্রধানমন্ত্রী হবার জন্যে সেই ডাকাতকে তিনি তার পক্ষে এনেছিলেন।

গঠন করেছিলেন কোয়ালিশন সরকার। সে সরকারে মুসলিম লীগ (ক্বাফ) ছিলো। ছিলো বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টি। যে দলের কোনো আদর্শই নেই। যে দল ক্ষমতায় যাবে বলে তাদের মনে হয়, তারা সেই দলের সাথেই যুক্ত হয়ে যায়।

ইমরান খান তার কোয়ালিশন সরকারে আরো আনেন মুত্তাহিদা কওমী মুভমেন্ট (এমকিউএম) —কে। এ দলটি মূলত করাচি শহরকেন্দ্রিক দল। দেশভাগের সময় হিন্দুস্তান থেকে যেসব মুহাজির এসেছিলো, তাদের অধিকার আদায়ের জন্যে এ দল গঠন করা হয়। যদিও এ দলের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ রয়েছে এবং এ দলের প্রতিষ্ঠাতা একজন শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসী আলতাফ হোসাইন, যিনি বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হবার জন্যে ইমরান খান এ দলকেও তার কোয়ালিশনে আনেন। তাদেরকে দুইটি মন্ত্রীর পদ দেন। বিনিময়ে তিনি তাদের সাতজন সংসদ সদস্যের সমর্থন পান।

এখানেই শেষ না। একটু আগে জাহাঙ্গির তারিনের কথা বললাম না? ইমরান খানের ব্যবসায়িক বন্ধু। ইমরান খান সরকার গঠনের পর হুট করে লক্ষ্য করেন চিনির যথেষ্ট সরবরাহ থাকার পরেও চিনির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। তদন্তে জানা যায় কয়েকজন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে চিনির দাম এভাবে বাড়িয়ে প্রচুর মুনাফা অর্জন করছে। এ ব্যবসায়ীর মধ্যে জাহাঙ্গীর তারিনও ছিলেন। চাপের মুখে ইমরান খান তার একসময়ের প্রিয় বন্ধু জাহাঙ্গীর তারিনের বিরুদ্ধে একশন নিতে বাধ্য হন। জাহাঙ্গীর তারিন ইমরান খানকে ত্যাগ করে লন্ডনে চলে যান।

লন্ডনে গেলেও তেহরিকে ইনসাফের কিছু সংসদসদস্য শুরু থেকেই জাহাঙ্গীর তারিনের প্রতি অনুগত ছিলো। এছাড়া বিভিন্ন দল থেকে যাদেরকে এনে জোড়াতালি দিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছিলো, তাদের অনেকেই ছিলো জাহাঙ্গীর তারিনের প্রতি অনুগত।

ইমরান খানের কোয়ালিশন সরকারের কাছে ছিলো ১৭৮টি সিট। বিরোধী দলের কাছে ছিলো ১৬২টি সিট। তাই ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা খুব কঠিন কিছু ছিলো না। সত্যি বলতে খুব কম মানুষই ভেবেছিলো, ইমরান খান এতোটা লম্বা সময় টিকে যাবেন। জাহাঙ্গীর তারিন কিংবা তার কোয়ালিশনে থাকা কোনো দল সমর্থন সরিয়ে নিলেই তিনি গদি হারাতেন।

এবার দেখা যাক, ইমরান খানের বিরোধী দলে কারা কারা আছে?

মুসলিম লীগ (নুন), পিপলস পার্টি এবং জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম। এই তিন দল মিলে গঠন করেছে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভম্যান্ট। সংক্ষেপে, পিডিএম। পিডিএম মনে করে, পাকিস্তান আর্মি ভোটচুরি করে ইমরান খানকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এরা সবাই গত ৩০-৪০ বছর ধরে পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলো। এদের জন্যে সরকারি দলের কিছু সংসদ সদস্যকে নিজের দলে লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসা কঠিন কিছু না।

আর ঠিক সেটাই ঘটেছে এ বছরের মার্চ মাসে। সবাই অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, তেহরিকে ইনসাফের ১২-১৫ জন সংসদসদস্য বিরোধী দলে চলে গেছে। যার অর্থ, ইমরান খানের কাছে এখন আর ১৭২ জন সংসদ সদস্য নেই। তিনি আর সরকার চালানোর বৈধতা রাখেন না।

ঠিক এ নাজুক সময়ে বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টি বুঝতে পারে হাওয়া এখন বিরোধী দলের দিকে। তারাও ইমরান খানকে ত্যাগ করে। ইমরান খানকে ত্যাগ করে মুত্তাহিদা কওমী মুভমেন্টের ৭ জন সদস্যও। কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী তেহরিকে ইনসাফে এসেছিলো ২০১৮-তে জাহাঙ্গীর তারিনের নেতৃত্বে। তারাও সুযোগ বুঝে বিরোধী দলে চলে যায়। জাহাঙ্গীর তারিন, এভাবে ইমরান খানের বিরুদ্ধে মধুর প্রতিশোধ নেয়। এমনকি মুসলিম লীগ (ক্বাফ), যাদের সাথে মুসলিম লীগ (নুন) — এর দীর্ঘ বিরোধের ইতিহাস রয়েছে, তারাও বিরোধী দলের সাথে হাত মেলানো শুরু করে। যাকে ইমরান খান পাঞ্জাবের সবচে’ বড়ো ডাকাত বলতেন, সেই পারভেজ এলাহিকে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী বানানোর লোভ দেখিয়ে তিনি মুসলিম লীগ (ক্বাফ) —কে দলত্যাগ করা থেকে বিরত রাখেন।

পুরো বিরোধী দলকে একত্র করতে সবচে’ বেশি পরিশ্রম করেন জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের মাওলানা ফজলুর রহমান। তিনি লম্বা সময় ডান-বাম সব দলের সাথেই ক্ষমতায় ছিলেন। পাকিস্তানের একটা প্রদেশের ক্ষমতাও ছিলো তার কাছে। কাশ্মীর কমিটিতে ছিলেন। নেতা হিসেবে তিনি চতুর সন্দেহ নেই কিন্তু প্রশাসক হিসেবে তিনি কতোখানি সফল ছিলেন সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাশ্মীর কমিটিতেও তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো। মাওলানা ফজলুর রহমান দেওবন্দি ধারার হওয়ায় বাংলাদেশের কওমী ধারার ভাইরা তাকে খুব পছন্দ করেন। সম্মান করেন।

এবার পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক ঘটনাচক্রের দিকে চোখ বুলানো যাক। ঘটনার শুরু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে। কাকতালীয়ভাবে রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইমরান খান রাশিয়া সফরে যান। যার কারণে পশ্চিমা মিডিয়াতে তিনি অনেক সমালোচিত হন। এরপর জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোটদানে পাকিস্তান বিরত থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২১ জন এম্বাসেডর পাকিস্তানকে ভোটদানে বিরত না থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার আহ্বান জানায়। যেটা একেবারেই প্রটোকলবিরোধী কাজ। কোনো এম্বাসেডরের অধিকার নেই কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলার, তিনি কী করবেন আর কী করবেন না।

মজার ব্যাপার, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোটদানে হিন্দুস্তানও বিরত ছিলো। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলো ভারতের ব্যাপারে আশ্চর্যরকমের নীরবতা পালন করে। ইমরান খান এ দ্বিমুখী নীতির কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে এক জনসভায় বলেন, “আপনারা কেন আমাদেরকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দিতে বলছেন? কেন হিন্দুস্তানকে বলছেন না? আপনারা আমাদের হুকুম কেন দিচ্ছেন? আমরা কি আপনাদের গোলাম?"

ইমরান খানের এ তীব্র প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানে তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। কারণ, আগে যারা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন— শরীফ ও ভুট্টো খানদান— তারা কখনোই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার হিম্মত করতো না।

এখানে বলে রাখি, মার্চের আগে ইমরান খান কিন্তু পাকিস্তানে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিলেন। দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম, মুদ্রাস্ফীতি, রুপির অস্বাভাবিক পতনের কারণে পাকিস্তানের মানুষ তার ওপর বেশ ক্ষিপ্ত ছিলো। সবাই ধরেই নিয়েছিলো, ২০২৩ এ যে নির্বাচন হবে, তাতে তিনি গো-হারা হারবেন। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তার এ বক্তব্য পাকিস্তানের মানুষের মাঝে বেশ প্রভাব ফেলে।

কথা হচ্ছে, ইমরান খান এতো শক্ত বক্তব্য কেন দিতে গেলেন? চিন্তা করে দেখেন, তার কিন্তু হারানোর কিছু নেই। পশ্চিমারা যদি তাকে সরিয়ে দেয়, তাহলে তিনি বলতে পারবেন, পাকিস্তানে আজাদ পররাষ্ট্রনীতি আনার কারণে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আবার যদি চুপ থাকেন, তাও তিনি সামনের জাতীয় নির্বাচনে হেরে যাবেন। ইমরান খান তাই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার সিদ্ধান্তই নিলেন। যদিও এ সিদ্ধান্ত তিনি একদিনে নেন নি। শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো, তিনি আমেরিকান ব্লক থেকে বেরিয়ে এসে চীনা ব্লকে যেতে চাচ্ছেন। যার কারণে কাশ্মীর-ফিলিস্তিন নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলা ইমরান খান কখনোই উইঘুর মুসলিমদের পক্ষে কথা বলেন না। কারণ, এতে চীন রুষ্ট হবে।

পাকিস্তানের রাজনীতি যখন পেন্ডুলামের মতো এদিক-সেদিক দুলছে, ঠিক সে সময় এ বছরের ৭-ই মার্চ আমেরিকা ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাঝে খুব উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। সে বৈঠকে ওয়াশিংটন সাফ জানিয়ে দেয়, ইমরান খান যদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকেন, তবে পাকিস্তানের সামনে অনেক বিপদ অপেক্ষা করছে। খুব শীঘ্রই পাকিস্তানে নো-কনফিডেন্স মোশন (অনাস্থা প্রস্তাব) আসবে সংসদে। যদি ইমরান খান তা বানচালের চেষ্টা করেন, তবে পাকিস্তানকে এর জন্যে পস্তাতে হবে। আর যদি ইমরান খান অনাস্থা প্রস্তাবে হেরে যান, তবে পাকিস্তান অতীতে যা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তা মাফ করে দেবে।

এ ধরনের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শুধু মৌখিকই থাকে না, তাদের কথাগুলো ডকুমেন্ট আকারে লিপিবদ্ধ থাকে। দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ বৈঠকের ডকুমেন্ট ইমরান খানের কাছে চলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, যুক্তরাষ্ট যে কোনো মূল্যে তাকে সরাতে চাচ্ছে।

৭-ই মার্চ যুক্তরাষ্ট পাকিস্তানকে হুমকি দেয় শীঘ্রই যে অনাস্থা প্রস্তাব আসবে সংসদে তা যেন বানচালের চেষ্টা না করা হয়, করলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। আশ্চর্যের ব্যাপার, ঠিক এর পরদিন, অর্থাৎ ৮-ই মার্চ পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দল— নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ (নুন), ভুট্টোর পিপলস পার্টি এবং মাওলানা ফজলুর রহমানের জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম ইমরান খানের বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। অনেকেই তাই অভিযোগ তোলা শুরু করে, তাদের এ অনাস্থা প্রস্তাব আমেরিকার ইশারাতেই হয়েছে।

কথা হচ্ছে, বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব কেন এ সময়ে আনল? যখন কিনা জাতীয় নির্বাচনের মাত্র এক বছর বাকি আছে? এর বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথমত, বিরোধী দলে যারা প্রথম সারির নেতা তাদের বিরুদ্ধে বেশ বড়ো বড়ো দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তারা যে কোনো সময়ে গ্রেফতার হতে পারেন।

মুসলিম লীগ (নুন) নওয়াজ শরীফকে সুপ্রীম লিডার মনে করে। দলকে গুছানোর জন্যে তার উপস্থিতি প্রয়োজন। সমস্যা হচ্ছে, তার এখন দুর্নীতির দায়ে জেলে থাকার কথা। জেল থেকে বাঁচার জন্যে অসুস্থতার ভাণ ধরে তিনি এখন লন্ডনে আছেন। ইমরান খান যতোদিন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, তিনি দেশে আসবেন না, এটা নিশ্চিত। তাছাড়া সুপ্রীম কোর্ট তাকে আজীবনের জন্যে রাজনীতি থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছে। তিনি যদি আসেনও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, যদি না সুপ্রীম কোর্ট আগের আদেশ রদ না করে দেয়। নওয়াজ শরীফের পর পার্টির সেকেন্ড ম্যান ইন চার্জ হচ্ছেন, শেহবাজ শরীফ। তিনি বিরোধী দলের নেতা। শেহবাজ শরিফের মাকসুদ চৌপরাসিকে নিয়ে যে মামলা আছে, সেটা একদম ওপেন এন্ড শাট কেইস। কেউ চাইলে অনলাইনে এ কেইসের ব্যাপারে পড়তে পারেন। হাসতে হাসতে মারা যাবেন।

গ্রেফতারের আশঙ্কায় আছেন পিপলস পার্টির আসিফ জারদারি, বিলওয়াল ভুট্টো, এমনকি জমিয়তের মাওলানা ফজলুর রহমানও। তাই তারা এতোটা ডেস্পারেট হয়ে ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাচ্ছিলেন। এছাড়া তারা ভেবেছিলেন, দ্রব্যমূলের উর্ধ্বগতির কারণে মানুষ এখন ইমরান খানের প্রতি নাখোশ। অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে তারা তেহরিকে ইনসাফের কোমর খুব সহজেই ভেঙ্গে দিতে পারবেন।

তাদের প্ল্যান ঠিকমতোই চলছিলো। ১৭২ জনের জায়গায় তারা ১৯৭ জন সংসদ সদস্যকে ম্যানেজও করে ফেলেছিলো। ঠিক তখন ইমরান খান ২৭শে মার্চ ইসলামাবাদে বিশাল এক রাজনৈতিক সমাবেশ করেন। সে সমাবেশে তিনি দাবী করেন, বিরোধী দলের নেতারা আমেরিকার সাথে হাত মিলিয়ে তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাচ্ছে। ৭-ই মার্চ পাকিস্তান ও আমেরিকার মাঝে যে বৈঠক হয়েছিলো, সে বৈঠকের চিঠির কপি তিনি নাটকীয়ভাবে বিশাল জনসভায় সবার সামনে দোলাতে থাকেন। যদিও অফিসিয়াল সিক্রেট এক্টের কারণে চিঠিতে কী লেখা আছে, তা বলার এখতিয়ার তার ছিলো না। ২৭শে মার্চের সমাবেশের পর থেকে ইমরান খানের দিকে জনসমর্থন ঝুঁকে যায়। প্রথম দিকে সবাই,

চিঠির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও যখন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে তিন বাহিনীর প্রধানের সামনে সে চিঠি রাখা হয়, আর তারা সবাই চিঠির সত্যায়ন করেন, তখন পাবলিক বুঝতে পারে ইমরান খান সত্যি কথাই বলছেন।

বিরোধী দল তবুও অনাস্থা প্রস্তাবের ব্যাপারে অনড় থাকে। কীভাবে আরো সংসদ সদস্য কেনা যায়, তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মাওলানা ফজলুর রহমান ঘোষণা করেন, পাঁচ লক্ষ আলেম ফতোয়া দিয়েছেন, সব পাকিস্তানিদের জন্যে ইমরান খানকে গতিচ্যুত করা ওয়াজিব। কিন্তু ইমরান খানকে সরিয়ে যে শরিফদের গদিতে আনা হবে তারা কীভাবে ইমরান খানের চেয়ে ভালো, এ প্রশ্নের উত্তর মাওলানা সাহেবের কাছে ছিলো না। ইমরান খানের সমাবেশের বিরুদ্ধে মাওলানা সাহেবও সমাবেশের ডাক দেন। বিরোধী দল ব্যস্ত থাকে সংসদ সদস্য কেনাবেচায় আর সমাবেশে।

এ ব্যস্ততার কারণে তারা চরম একটি রাজনৈতিক ভুল করে। কারণ, তাদের উচিত ছিলো প্রথমে সংসদের স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে তাদের দল থেকে কোনো স্পিকার নির্বাচন করা। তারপর অনাস্থা প্রস্তাব আনা।

পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার যদি মনে করেন যে কারণে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে, তা যথাযথ নয় কিংবা এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে, তাহলে তিনি সেই অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ করতে পারেন। আজ যখন বিরোধী দল খুব জোশের সাথে ১৯৭ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে ইমরান খানকে সরাতে সংসদে গেলো এবং দেখলো যে স্পিকার অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছেন, তখন তারা একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলো।

কারণ, উনারা তো এটাও প্ল্যানিং করে ফেলেছিলেন যে, অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হবার পর বিরোধী দল যে সরকার গঠন করবে, সেখানে কে কোন পদে থাকবে। শেহবাজ শরীফ প্রধানমন্ত্রী হবেন, মাওলানা ফজলুর রহমান রাষ্ট্রপতি হবেন, বিলওয়াল ভুট্টো হবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু স্পিকারের এ সিদ্ধান্তে সব বিরোধী দলের মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো।

তৎক্ষণাৎ তারা স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গেলো। সুপ্রিম কোর্ট সাধারণত স্পিকারের রায়ের বিরুদ্ধে রায় দেয়া থেকে বিরত থাকে। কিন্তু যদি তাও রায় দেয়, তাহলে সংসদে আবার ভোটাভুটি করতে হবে নতুন স্পিকারের জন্যে। তারপর অনাস্থা প্রস্তাবের ব্যাপারে ভোটাভুটি হবে। সমস্যা হচ্ছে, অনাস্থা প্রস্তাবে ভোটাভুটি ৭ দিনের মধ্যে হওয়ার নিয়ম রয়েছে। আর আজকেই ছিলো সপ্তম ও শেষদিন। আজকের দিন যেহেতু অতিবাহিত হয়ে গেছে, তাই সুপ্রিম কোর্টের জন্যে আবার অনাস্থা প্রস্তাবের জন্যে ভোট নেয়ার আদেশ দেয়া আইনবিরোধী হবে।

কিন্তু তাও যদি সুপ্রীম কোর্ট ভোটাভুটি করতে বলে, সেটা তো সংসদে করতে হবে। সেটা যেন না করতে পারে সে জন্যে ইমরান খান প্রেসিডেন্টকে দিয়ে আজকেই সংসদ ভেঙ্গে দেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে পুনরায় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে দেন। বিরোধী দল আবারও হতভম্ব হয়ে যায় ইমরান খানের এমন ঘোষণায়। কারণ, সংসদই যেহেতু ভেঙ্গে গেছে, তাহলে অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটি কীভাবে হবে? কোথায় হবে?

এখন তাই ইমরান খান রাজনীতির ময়দানে আপাতত বিজয়ী হয়েছেন এবং বিরোধী দলকে ক্লিন-বোল্ড করেছেন, এমনটা বলাই যায়। তবে পাকিস্তান সব সম্ভবের দেশ। সেখানে কখন কী হয়— বলা যায় না।

স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের জনগণ আমেরিকানদের এমন নাক গলানো ভালোভাবে নেয় নি। ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হলে সম্ভবত ইমরান খান জিতে যাবেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগেরবার বন্ধু জাহাঙ্গীর তারিনের কথা শুনে যে ভুল তিনি করেছেন, সে ভুল এবার করবেন না। দুর্নীতিবাজ ও নীতিহীনদের টিকেট না দিয়ে যারা আদর্শিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে তাদেরকেই টিকেট দেবেন। এভাবে পশ্চিমাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যদি ইমরান খান রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারেন, তবে সম্ভবত তা আরো অনেক বিশ্বনেতাদের অনুপ্রাণিত করবে আমেরিকান ব্লক থেকে বের হবার জন্যে। আর এটাও সত্য এর জন্যে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক মাশুল দিতে হবে।

সবশেষে একটা কথা বলে রাখি। আমি কারোরই ফ্যান নই। না ইমরান খানের, না অন্যদলের। ইমরান খান সুফি চিন্তাধারা লালন করেন। ওয়াহাবি-দেওবন্দি ধারার লোকদের খুব একটা পছন্দ করেন না। তার লেখা আত্মজীবনী পড়ে বুঝেছি, ইসলাম সম্পর্কে তার ধারণাও খুব একটা পরিষ্কার না। তবে তার একটা বিষয় সবাই স্বীকার করেন। সেটা হচ্ছে, তিনি প্রচণ্ড রকমের সৎ।

অন্য রাজনীতিবিদরা যখন ক্ষমতায় গেলে ব্যবসা করা শুরু করে, দেশকে নিজের বাপ-দাদার সম্পত্তি মনে করে, সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার পরেও অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। ক্ষমতায় থাকার সময়ে জারদারি-শরিফরা বাইরে গেলে পুরো পরিবার নিয়ে জনগণের টাকা উড়িয়ে লাখ লাখ ডলার খরচ করতো, ইমরান খান সেখানে কয়েক হাজার ডলারে ভ্রমণ সেরে ফেলেন। এছাড়া দেশি-বিদেশি মিডিয়াতে তিনি বেশ সুন্দরভাবে পাকিস্তানকে উপস্থাপন করতে জানেন। যার কারণে তার অনেক সমর্থক রয়েছে।

তবে যদি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, দুর্নীতির কথা বলা হয়— ইমরান খান পাকিস্তানের অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীর মতোই এখানে ব্যর্থ হয়েছেন। এর পেছনে কারণও আছে। যখনই তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে একশন নিতে গিয়েছেন, তখনই তাকে গদি হারানোর আতঙ্কে ভুগতে হয়েছে। তার সহযোগীরাই তাকে গদিচ্যুত করার হুমকি দিয়েছে।

রাজনীতিতে বন্ধু-শত্রু বলে কিছু নেই। ইমরান খান যাকে ডাকাত বলতেন, তার সাথে হাত মিলিয়েই তিনি এখন পাঞ্জাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। মুসলিম লীগ আর পিপলস পার্টি তো অনেকটা আমাদের দেশের আওয়ামীলীগ আর বিএনপির মতো। তাদের তিক্ততার লম্বা ইতিহাস আছে। তবুও নিজেদের প্রয়োজনে তারা এখন এক হয়ে গেছে। মুত্তাহিদা কওমী মুভমেন্টের বহু সদস্য পিপলস পার্টির কারণে গুম হয়েছে, খুন হয়েছে। তারাও আজ পিপলস পার্টির সাথে হাত মিলিয়েছে। তাদের মাঝে সমস্যা নেই। সমস্যা আমাদের মাঝে। আমরা সবকিছু নিয়ে মারামারি করতে পছন্দ করি। হোক সেটা ধর্মীয় বিষয়, হোক সেটা রাজনৈতিক।

পাকিস্তানকে নিয়ে এতো লম্বা স্ট্যাটাস দেয়ার কারণ কী? তাদের রাজনীতি কি বাংলাদেশে প্রভাব ফেলবে? আমার মনে হচ্ছে, ফেলবে। কীভাবে ফেলবে তা সময়ই হয়তো বলে দেবে। আপাতত পাকিস্তানের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে এ কবিতাটা যেন বাস্তব হয়ে ধরা দেয়-

“দুশমানি জাম কার কারো লেকিন ইয়ে গুঞ্জায়িশ রাহে,

জাব কাভি হাম দোস্ত হো জায়ে তো শারমিন্দা না হো।”

Writer: Shihab Ahmed Tuhin