February 1, 2024

অচিনপুর

অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছি।সম্পূর্ণ অচেনা পথে এভাবে একা কতক্ষণ হাঁটা যায়! তবুও হাঁটছি।যেতে হবে বহুদূর,সেই অচিনপুর। আকাশের লাল আবরণ উধাও হয়ে যাচ্ছে।আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে শরতের মেঘের মত ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ।এতক্ষণে রাত বুঝে গেছে তার নেমে আসার সময় হয়েছে, হাঁস মুরগি ও নীড়ে ফেরা পাখিদের শব্দে চুপচাপ বসেছিলো সে আকাশের উপারে।বহু আগেই নিভে গেছে আগুন ঝরানো সূর্যের গোপন তেজ টুকু।এ অবস্থায় ক্ষেতের আইল ধরে আর কতটা হাঁটতে হবে কে জানে।অবশ্য হাঁটার কথা ছিলো না।কোনো ভাবেই না।কথা ছিলো,শুত্রাপুর স্টেশনে নেমে একটা ভ্যান নেবো এবং পঁয়তাল্লিশ মিনিটে মামার বাড়ি।ভ্যান নিয়েছিলাম ঠিকই,কিছুদূর গিয়ে চালক বললো,নামেন আর যাওয়া যাবে না।

কেনো, আর যাওয়া যাবে না কেনো?

ভাঙা রাস্তা ভ্যান যাবে না।

তাহলে আমি যাবো কিভাবে??

এক কাজ করেন এইযে ক্ষেতের আইল দেখছেন,হাঁটা ধরেন। মিনিটদুয়েক হাঁটলেই চেয়ারম্যনবাড়ি।

ঝগড়া করা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ।এর মধ্যে অচেনা গ্রাম।তাই ঝগড়া করলাম না।সোজা দেখিয়ে দেয়া জলকাঁদায় মাখামাখি 'পুলসিরাতসম' সরু আলপথে হাঁটা ধরলাম।দু'মিনিট হাঁটার পর আরো কত দু'মিনিট হেঁটেছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই।হাঁটছি তো হাঁটছি। পথে অবশ্য দু'একজনকে জিজ্ঞেস করেও সুনির্দিষ্ট উত্তর পাইনি।কেউ বলে,আরো দুই ক্রোশ,কেউ বলে তিন।শুনে মাথাটা দু'একবার চক্কর দিতে চায়,তবে তাকে ঝাঁকি দিয়ে বলি,এই রাত-বিরাতে ট্রেন চলেনা, ফিরে যাওয়ার উপায় নেই, হাঁটতে তকে হবেই।

শেষ কবে মামা বাড়ি গিয়েছিলাম মনে নেই।আদৌ গিয়েছি কিনা তাও জানি না। এবার বাড়ি এসে শোনি,মামা চিঠি পাঠিয়েছেন।খুব করে লিখেছেন;আমি আসলে যেনো দ্রুতই পাঠিয়ে দেয়া হয়।আমাকে দেখার নাকি ভিশন সাধ।শুনেছি মামার ডজন খানেক আমের বাগান,যা রেখে কোথাও নড়ার যো নেই। নাহয় তিনি নিজেই আসতেন।মূলত আমের কথা শুনেই এদিক টায় আসা।আমের পাগল আমি ছোট থেকে।কাঁচা-পাঁকা কত আম।যত ইচ্ছা খাবো, যত খুশি পেড়ে নিবো।কিন্তু তা আর হলো কই পথই যে শেষ হয় না!এতক্ষণে একটা বড় সড়কে উঠেছি।

চোখের সামনে ভৌতিক অন্ধকার।হাতে কোন টর্চ নেই।কখন যে পায়ের সাথে সাপখোপ জড়িয়ে ছোবল দিয়ে বসে ঠিক নেই।আকাশের আবছা আলোয় যতটুকু পথ দেখা যায় এই ভরসা।কিছুদূর হেঁটে চোখে পড়লো দূরে বহুদূরে অন্ধকারের সমুদ্রে বাতিঘর হয়ে টিমটিমে আলো জেলে থাকা একখানা চায়ের দোকান,চায়ের দোকানই হেবে হয়তো!যাক কিছুটা তেষ্টা মেটানো যাবে,সেই সাথে রাস্তাঘাটের নিশানাও নেয়া যাবে।

এক কাপ চা দিয়েন।

দুধ চা না রং চা?

রং চা।

এখন মেজাজ প্রচন্ড খারাপ, নাহয় চায়ে বাকরখানি ভিজিয়ে আয়েশ করে খাওয়া যেতো।

আদা নাকি আদা ছাড়া?

আদা

আইচ্ছা,তয় ভাইজানরে তো ঠিক চিনলাম না?

আমি এ গ্রামে নতুন।

হেইডা তো বুজচ্ছি। তয় ভাইজান জাইবেন কই?

শংকরপুর।

ভাইজান মনে হয় আমার সাথে তামাশা করে!

কই, এখানে তামাশার কি পেলেন?

এইডাই তো শংকরপুর।

কি, এটা শংকরপুর!!

তয় ভাইজান কার বাড়ি জাইবেন?

চেয়ারম্যানবাড়ি, শফিক চেয়ারম্যান, আপনি চেনেন?

লোকটার চাহনি দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, বেচারা আমাকে বেয়াক্কল ঠাউরেছে, এক বিদেশি স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞেস করছে এলাকার চেয়ারম্যানবাড়ি চেনে কিনা!